1. pragrasree.sraman@gmail.com : ভিকখু প্রজ্ঞাশ্রী : ভিকখু প্রজ্ঞাশ্রী
  2. avijitcse12@gmail.com : নিজস্ব প্রতিবেদক :
সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন

বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বৌদ্ধ অনাত্মা দর্শন

ড. সুমনপ্রিয় ভিক্ষু
  • সময় মঙ্গলবার, ২৫ মে, ২০২১
  • ১৫৫ পঠিত
আজ শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। সমগ্র বিশ্বের বৌদ্ধরা আজ এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্রতার মধ্য দিয়ে পালন করছেন। আজ তারা বৌদ্ধ বিহারে যাবে, সমবেত হয়ে পূজা – বন্দনা করবে, দান দিবে, বাতি-ধুপ জ্বালাবে, শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার অনুশীলন করবে, একে অপরের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ কুশল বিনিময় করবে, রুচি সম্মত খাবার গ্রহণ করবে ইত্যাদি। মূলত বৈশাখী পূর্ণিমাকে বুদ্ধ পূর্ণিমা বলা হয়।
এই দিনে সিদ্ধার্থ গৌতমের একাধিক বিরল ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, যেমন বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে সিদ্ধার্থ গৌতম রাজ পুত্র হয়ে লুম্বিনী উদ্যানে জন্ম লাভ করেছিলেন, পিতা শাক্য রাজ্যের রাজা শুদ্ধোধন, মাতা রানী মহামায়াদেবী। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে পবিত্র বুদ্ধ গয়ার বোধিমূলে সর্ব তৃষ্ণা ক্ষয় করে সম্যক সম্বুদ্ধত্ত্ব জ্ঞান লাভ করে জগৎ পূজ্য বুদ্ধ হয়েছিলেন। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে ৪৫ বছর ধর্ম প্রচার করে ৮০ বছর বয়সে কুশীনগরে জোড়াশাল বৃক্ষতলে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। তাই এই পূর্ণিমাকে বৌদ্ধ সাহিত্যে ত্রিস্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমা বলা হয়।
রাজ পুত্র সিদ্ধার্থের জন্মের ৭ দিন পর মাতা মহামায়াদেবীর মৃত্যু হলে বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী তাঁর লালন পালনের ভার গ্রহণ করেন। সিদ্ধার্থের রাজ ঐশ্বর্যে বড় হয়ে সর্ব বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেন এবং বয়োপ্রাপ্ত হলে রূপসী কন্যা যশোধরার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাঁর অস্থিরতা বাড়তে থাকে। এই অস্থিরতা কাঠানোর নিমিত্তে নগর ভ্রমণের ইচ্ছে পোষণ করলেন। রাজা শুদ্ধোধন নগর ভ্রমণের সুব্যবস্থাপনা করলেন। প্রথম দিন রাজ দরবারের পূর্ব দরজা দিয়ে নগর ভ্রমণে বের হলেন। কিছু দূর যেতেই ফুলে ফলে সাজানো নগরে দেখতে পেলেন এক জরাগ্রস্ত ব্যক্তি। হঠাৎ সিদ্ধার্থের চোখে পড়তেই অশ্ব রথ চালক ছন্দককে রথ থামাতে নির্দেশ দিলেন, তার কাছে জেনে নিলেন মানুষ কেন জরাগ্রস্ত হয়! দ্বিতীয় দিন রাজ দরবারের দক্ষিণ দরজা দিয়ে নগর ভ্রমণে বের হলেন। কিছু দূর যেতেই চোখে পড়ল এক ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি। জেনে নিলেন মানুষ কেন ব্যাধিগ্রস্ত হয়! তৃতীয় দিন রাজ দরবারের পশ্চিম দরজা দিয়ে নগর ভ্রমণে বের হলেন। কিছু দূর যেতেই অনাকাঙ্খিতভাবে দেখতে পেলেন কিছু লোক মৃত ব্যক্তিকে কাঁদে নিয়ে শ্মশানে যাচ্ছে। জেনে নিলেন মানুষের কেন মৃত্যু হয়! চতুর্থ দিন রাজ দরবারের পূর্ব দরজা দিয়ে নগর ভ্রমণে বের হলেন। কিছু দূর যেতেই চোখে পড়ল এক শান্ত, সৌম্য এক সন্ন্যাসী ব্যক্তি। জেনে নিলেন মানুষ কেন সন্ন্যাসী হয়! চার দিন নগর ভ্রমণে চারটি বিরল দৃশ্য দেখে খুবই চিন্তিত হলেন। এই দৃশ্যের মূল কারণ জানতে সংকল্পবদ্ধ হলেন। এরই মধ্যে সংবাদ আসল তার পুত্র সন্তান রাহুলের জন্ম হল। মায়ামোহের বন্ধন ছিন্ন করতে সংকল্প করলেন। বৈশাখী পূর্ণিমা সমাগত, স্ত্রী-পুত্রকে এক পলক দেখে মায়ার বন্ধন ত্যাগ করে, রাত্রিকালীন সময়ে অশ্বরথ ও ছন্দককে নিয়ে সবার অজান্তে গৃহ ত্যাগ করলেন।
দীর্ঘ ৬ বছর কঠোর সাধনা করে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে বুদ্ধ গয়ার বোধিমূলে বজ্রাসনে বুদ্ধত্বজ্ঞান লাভ করলেন। জানতে পারলেন তাঁর ঐ সংকল্পের মূল কারণ, জানতে পারলেন জন্ম-মৃত্যুর রহস্যসহ জীবতত্ত্ব ও নির্বাণতত্ত্ব। জগৎ পূজ্য সম্যক সম্বুদ্ধ হিসেবে আবির্ভুত হলেন। তাঁর ধর্মতত্ত্বে অনাত্মা লক্ষণ সূত্রে বলেছেন: হে ভিক্ষুগণ! অতীত, অনাগত, বর্তমান রূপ, অধ্যাত্ম বা বাহ্যরূপ, স্থুল বা সূক্ষ্ম রূপ, হীন বা উৎকৃষ্ট রূপ, দূরবর্তী বা নিকটবর্তী রূপ তাহা (সকল প্রকার রূপ ) আমার নয়, তাহা আমি নই ; তাহা আমার আত্মাও নয়। এইরূপ বিষয়টি যথাযথভাবে সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা দেখতে হবে। অতীত, অনাগত, বর্তমান বেদনা, অধ্যাত্ম বা বাহ্য বেদনা, স্থুল বা সূক্ষ্ম বেদনা, হীন বা উৎকৃষ্ট বেদনা, দূরবর্তী বা নিকটবর্তী বেদনা তাহা (সকল প্রকার বেদনা ) আমার নয়, তাহা আমি নই ; তাহা আমার আত্মাও নয়। এইরূপ বিষয়টি যথাযথভাবে সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা দেখতে হবে। অতীত, অনাগত, বর্তমান সংজ্ঞা, অধ্যাত্ম বা বাহ্য সংজ্ঞা, স্থুল বা সূক্ষ্ম সংজ্ঞা, হীন বা উৎকৃষ্ট সংজ্ঞা, দূরবর্তী বা নিকটবর্তী সংজ্ঞা তাহা (সকল প্রকার সংজ্ঞা ) আমার নয়, তাহা আমি নই; তাহা আমার আত্মাও নয়। এইরূপ বিষয়টি যথাযথভাবে সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা দেখতে হবে। অতীত, অনাগত, বর্তমান সংস্কার, অধ্যাত্ম বা বাহ্য সংস্কার, স্থুল বা সূক্ষ্ম সংস্কার, হীন বা উৎকৃষ্ট সংস্কার, দূরবর্তী বা নিকটবর্তী সংস্কার তাহা (সকল প্রকার সংস্কার) আমার নয়, তাহা আমি নই; তাহা আমার আত্মাও নয়। এইরূপ বিষয়টি যথাযথভাবে সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা দেখতে হবে। শ্রুতবান আর্যশ্রাবক বিষয়টিকে এইরূপে নির্বেদ প্রাপ্ত হয়; রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞানে নির্বেদ হয়; নির্বেদ হেতু বীতরাগ হয়, বীতরাগ হেতু বিমুক্ত হয়, বিমুক্ত হলে বিমুক্ত হয়েছি রূপে জ্ঞান হয়, জন্মবীজ ক্ষীণ হয়েছে, ব্রহ্মচর্য উদযাপিত হয়েছে, করণীয় কর্ম সম্পন্ন হয়েছে, অতঃপর এই সংসারে আর পুনরাগমন করতে হবে না বলে প্রকৃতরূপে জানতে পারে। এইরূপ ভাষিত হলে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুগণ ভগবানের ভাষণকে প্রীতমনে অভিনন্দিত করলেন। এইরূপ ভাষণের পর পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুগণ আসব (তৃষ্ণা) মুক্ত হলেন। সেই সময় পর্যন্ত জগতে মাত্র ছয়জন অর্হৎ উৎপন্ন হয়েছিল।
আজ পবিত্র বুদ্ধ পূর্ণিমা দিবসে সকলের মন পবিত্র পুণ্য চেতনায় উদ্ভাসিত হউক। মৈত্রীর দ্বারা সকল অপশক্তিকে, সম্যক জ্ঞানের দ্বারা সকল অন্ধকার – কুসংস্কারকে দূর করুক, সাম্য-মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হউক। প্রার্থনা করি, সকলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা প্রাপ্ত হউক।
লেখক: ধর্মদূত ভদন্ত ড. সুমনপ্রিয় ভিক্ষু, তথ্য ও প্রযুক্তি সচিব: বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা। উপাধ্যক্ষ: পূর্ব সাতবাড়িয়া বেপারীপাড়া রত্নাঙ্কুর বিহার, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম।

শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো
© All rights reserved © 2019 bibartanonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbazarbibart251
error: Content is protected !!