1. pragrasree.sraman@gmail.com : ভিকখু প্রজ্ঞাশ্রী : ভিকখু প্রজ্ঞাশ্রী
  2. avijitcse12@gmail.com : নিজস্ব প্রতিবেদক :
রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন

আজ পূজ্য বনভান্তের নবম প্রয়াণ দিবস

প্রতিবেদক
  • সময় শনিবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২১
  • ৮৭ পঠিত

আজ ৩০ জানুয়ারি। রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারের অধ্যক্ষ , পরমপূজ্য শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তের নবম প্রয়াণ বার্ষিকী ।

২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি অন্যান্যবারের মতো এ’বছরও পূজ্য বনভান্তের ৯৩তম জন্মদিন জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্‌যাপিত হয়। এবছর বনভান্তের জন্মদিন উপলক্ষে থাইল্যান্ডের ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবং বনভান্তের শিষ্যসংঘের সার্বিক সহযোগিতায় ২৯৪ জন কুলপুত্রকে প্রব্রজ্যা প্রদান করা হয়। ১১ জানুয়ারি ভোরে পূজ্য ভান্তে তাঁর শিষ্যসংঘকে প্রাত্যহিক ধর্মদেশনা প্রদান করেন। বলা বাহূল্য, এটি ছিল তাঁর শিষ্যসংঘের উদ্দেশে সর্বশেষ ধর্মদেশনা। ১৩ জানুয়ারি লে. জেনারেল জগৎ জয়সুরিয়া, কমান্ডার অব দ্য শ্রীলঙ্কান আর্মি, রাজবন বিহার পরিদর্শন করেন এবং ভিজিটরস বইয়ে স্বাক্ষর করেন। ১৫/১৬ জানুয়ারি পূজ্য ভান্তে ঠাণ্ডাজনিত কারণে সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি পূজ্য বনভান্তের জ্ঞাতিবর্গ ভান্তের উপস্থিতিতে ‘বনভান্তের বিশ্রামাগার’-এ সংঘদান করেন। এবং তাঁর কনিষ্ট ভ্রাতা জহর লাল-প্রদত্ত সর্বশেষ আহার গ্রহণ করেন। পরদিন হতে পূজ্য ভান্তে সম্পূর্ণ খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করেন—শুধুমাত্র কখনও কখনও সামান্য পরিমাণ কোকাকোলা পানীয় পান করেন। এরপর থেকে ক্রমেই তাঁর অসুস্থতা বাড়তে থাকে। ২৩ জানুয়ারি পূজ্য ভান্তের কনিষ্ঠ ভ্রাতা জওহর লাল চাকমা রাঙামাটি সদর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ২৬ জানুয়ারি পূজ্য ভান্তের শারীরিক অবস্থা ভীষণভাবে অবনতি হওয়ায় এক জরুরি আলোচনা আহ্বান করা হয়। উক্ত সভায় পূজ্য ভান্তের শিষ্যসংঘ, মেডিকেল বোর্ডের ডাক্তাররা ও চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাজধানী ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২৭ জানুয়ারি বেলা ১২:০৮ মিনিটের দিকে পূজ্য ভান্তের শত শত শিষ্য ও হাজারো ভক্ত-অনুরাগী মিলিত হয়ে পূজ্য ভান্তের আশু রোগমুক্তি কামনায় রাঙামাটি সার্কিট হাউসের মাঠে শ্রদ্ধেয় ভান্তেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হয়। তার পর ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে সর্বাধুনিক উন্নত চিকিৎসা চলতে থাকে। উল্লেখ্য, তিনি বিগত বেশ কিছুদিন ধরে ডায়াবেটিস, নিউমোনিয়া, কিডনী ও লিভারের জটিল সমস্যায় ভুগছিলেন। ৩০ জানুয়ারি পরমপূজ্য অর্হৎ বনভান্তে শত শত শিষ্য ও লাখো লাখো ভক্ত-অনুরাগীর সনির্বন্ধ প্রার্থনা উপেক্ষা করে ঢাকাস্থ স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩:৫৬ মিনিটে পড়ন্ত বিকেলে প্রয়াণ লাভ করেন।

১৯২০ সালের ৮ জানুয়ারী তিনি রাঙামাটি শহর থেকে দক্ষিণে মগবান মৌজার মোরঘোনা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। লোকোত্তর সাধক বনভান্তের পবিত্র জন্মভিটাটি এখন আর নেই। কাপ্তাই হ্রদের পানির নিচে তলিয়ে গেছে! পুণ্যার্থী বৌদ্ধ অনুসারীরা বনভান্তের জন্মভিটার স্মৃতিকে জাগ্রত রাখার লক্ষ্যে ওই স্থানে একটি স্তম্ভ তৈরি করেছেন। হ্রদের পানি যখন হ্রাস পায়, তখন ওই স্তম্ভের চূড়া দেখে বনভান্তের জন্মস্থানকে নির্ণয় করা যায়। রাঙামাটি-কাপ্তাই নতুন সড়কের খুব কাছ থেকে এ স্তম্ভ দেখতে পাওয়া যায়।

স্রোতস্বিনী কর্ণফুলী নদীর তীরে ছায়া-সবুজে ঘেরা শান্ত প্রকৃতির মধ্যেই বনভান্তের শৈশব কেটেছে। বনভান্তের গৃহী নাম ছিল রথীন্দ্র চাকমা। শৈশবে তিনি আশপাশের প্রকৃতির মতোই শান্ত ছিলেন। দুরন্তপনার পরিবর্তে তাঁর মধ্যে সব সময় একটা শান্ত ও ভাবুক প্রকৃতি ছিল। একটু বড় হতেই তিনি বাবাকে হারান। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে অনটনের সংসারে মাকে আর্থিক সহায়তার জন্য একসময় রাঙামাটি শহরে এসে দোকানের সহকারীর কাজ নেন। এরই মধ্যে জনৈক গজেন্দ্র লাল বড়ুয়ার সঙ্গে তাঁর পরিচয়, বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতার সম্পর্ক তৈরি হয়। গজেন্দ্র বড়ুয়াও ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ লোক ও বৌদ্ধধর্মের প্রতি অগাধ বিশ্বাসী। মূলত গজেন্দ্র বড়ুয়ার অকুণ্ঠ সমর্থন ও অনুপ্রেরণা পেয়ে রথীন্দ্র তথা বনভান্তের মনে প্রব্রজ্যা গ্রহণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সহজতর হয়েছিল।

১৯৪৯ সালে ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে চট্টগ্রাম বৌদ্ধবিহারে রথীন্দ্র চাকমা প্রথম প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। সেখানে তিন মাস কাটানোর পর নির্বাণ মার্গের (দুঃখ থেকে মুক্তির পথ) উপায় সম্পর্কে কোনো ধারণা না পেয়ে তিনি কাপ্তাইয়ের সন্নিকটে ধনপাতায় ফিরে যান। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর তিনি গভীর অরণ্যে কঠোর সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। তাঁর সাধনাকালীন কাপ্তাই বাঁধ চালু হলে ধনপাতা এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে তাঁকে ওই এলাকা ত্যাগ করতে হয়। পরবর্তীকালে তিনি খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় গিয়ে তাঁর সাধনা চালিয়ে যান। গভীর বনে সাধনা করেন বলে তিনি জনসাধারণের কাছে ‘বন শ্রামণ’ হিসেবে পরিচিতি পান। প্রব্রজ্যা গ্রহণের ১২ বছর পর ১৯৬১ সালের ২৭ জুন জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথিতে তিনি উপসম্পদা (ভিক্ষু) গ্রহণ করেন। ‘বন শ্রামণ’ সাধনাতেই আনন্দ লাভ করেন বলে উপসম্পদা গ্রহণের পর তাঁর নাম রাখা হয় ‘শ্রীমৎ সাধনানন্দ ভিক্ষু’। উপসম্পদা গ্রহণের পর তিনি ‘বন শ্রামণ’ থেকে ‘বনভান্তের’ নামেই বেশি পরিচিতি পান।

ভিক্ষু হওয়ার পর বনভান্তে দীঘিনালায় ১৯৭০ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। এরপর তিনি প্রথমে দুরছড়ি ও পরে লংগদুর তিনটিলা বৌদ্ধবিহারে অবস্থান করে বৌদ্ধধর্ম প্রচার এবং ধর্মীয় দেশনা দিয়ে সাধারণ মানুষকে অপকর্ম থেকে দূরে থেকে সৎ পথে সমৃদ্ধ হওয়ার উপদেশ িদয়েছেন। ১৯৭৪ সালে রাজপরিবারের পক্ষে প্রয়াত রাজমাতা বিনীতা রায়, বর্তমান চাকমা রাজার মাতা প্রয়াত আরতি রায় ও সদ্ধর্ম উপাসক-উপাসিকাদের অনুরোধে তিনি রাঙামাটির রাজবনবিহারে অবস্থান করতে সম্মত হন। অবশেষে ১৯৭৭ সালের বৈশাখী পূর্ণিমার প্রাক্কালে তিনটিলা থেকে সশিষ্যে রাঙামাটিতে এসে স্থায়ীভাবে থাকা শুরু করেন।

১৯৭৪ সালে তিনটিলায় থাকাকালীন গৌতম বুদ্ধের সময়ে মহাউপাসিকা বিশাখা কর্তৃক প্রবর্তিত রীতি অনুসরণ করে প্রথমবারের মতো চরকায়
তুলা থেকে সুতা বের করে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কাপড় বুনে চীবর তৈরি করে দান করার প্রথা চালু করেন লোকোত্তর সাধক বনভান্তে; যা আজ অবধি বনবিহারের সব শাখায় প্রথা হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। কঠোর সাধনার মাধ্যমে বনভান্তে নিজের অভীষ্ট লক্ষ্য ও ধ্যানের পূর্ণতা লাভ করেছেন। তেমনি মোহপীড়িত মানুষের মুক্তির পথও তিনি আজীবন দেখিয়ে গেছেন। প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে যে বিহারে বনভান্তে অবস্থান করে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেছেন, রাঙামাটির সেই রাজবনবিহার বর্তমানে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে তীর্থস্থান হিসেবে অধিক পরিচিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জাতিসত্তাদের মধ্যে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। এ ছাড়া চাক, ম্রো ও খিয়াংদের মধ্যেও অনেকে বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করেন। লোকোত্তর সাধক বনভান্তের আবির্ভাবের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধধর্মের আচারাদি পালন ও প্রচারণা খুবই সীমিত পর্যায়ে ছিল। সেই সময়ে মূলত মারমা ভিক্ষুগণ বৌদ্ধধর্মকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। অন্যদিকে লুরী (তান্ত্রিক)দের মাধ্যমেও সামাজিক ও ধর্মীয় আচারাদি সম্পন্ন করা হতো। পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধধর্ম ব্যাপকভাবে তেমন একটা বিস্তার লাভ করেনি। লোকোত্তর সাধক বনভান্তে ধীরে ধীরে বৌদ্ধধর্মের অন্তর্নিহিত জ্ঞান ও পরিধি সম্পর্কে বিশেষ করে চাকমা সমাজে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বৌদ্ধদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ‘কঠিন চীবরদান’ কোন রীতি ও পদ্ধতিতে উদ্‌যাপন করা হয়, সে সম্পর্কে চাকমা সমাজ খুব বেশি অবহিত ছিল না। ১৯৭৪ সালে বনভান্তে সেই প্রাচীন রীতি প্রচলনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের মধে্য অনন্য নজির রচনা করেছেন। বর্তমানে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে বনভান্তের অন্তর্নিহিত সম্যক জ্ঞানের পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে।

বনভান্তে যে সময় প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন, সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের, বিশেষত চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ছিল না বললেই চলে। তাঁরা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম অনুকরণ করতেন। বিভিন্ন দেব-দেবী পূজার পাশাপাশি পশু বলি, গাঙপূজা, বৃক্ষপূজা ইত্যাদি রীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। সে সময়ে মূলত লুরী (তান্ত্রিক) গণই ধর্মীয় আচারাদিতে প্রধান ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু কালক্রমে সে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। বনভান্তের আবির্ভাবের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে ধীরে ধীরে বৌদ্ধধর্ম স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বনভান্তে তাঁর জীবদ্দশায় পার্বত্য চট্টগ্রামে হানাহানি ও নিপীড়নকে কখনোই সমর্থন করেননি। তিনি তাঁর ধর্মীয় দেশনা প্রদানের পাশাপাশি হানাহানি পরিহার করে পারস্পরিক মৈত্রী সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিতেন। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অন্যায়কে তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে সেসবের প্রতিবাদ করেছেন।

শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো
© All rights reserved © 2019 bibartanonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbazarbibart251
error: Content is protected !!