1. pragrasree.sraman@gmail.com : ভিকখু প্রজ্ঞাশ্রী : ভিকখু প্রজ্ঞাশ্রী
  2. avijitcse12@gmail.com : নিজস্ব প্রতিবেদক :
শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ০৫:১৯ অপরাহ্ন

বৌদ্ধ ধর্মে মন ও মানসিক স্তর সমূহ

রূপায়ন বড়ুয়া
  • সময় শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২০
  • ১৫৭ পঠিত

বৌদ্ধ ধর্মমহামতি গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ধর্ম। ত্রিপিটক এই ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রহ্ন। ত্রিপিটক তিনটি পিটকের সমন্বয়ে গঠিত, যথাঃ সূত্র পিটক, বিনয় পিটক এবং অভিধর্ম পিটক। 

এই পার্থিব জগতে কিভাবে সুখী জীবন যাপন করা যাবে বৌদ্ধ ধর্ম তার একটি পথনির্দেশক বা দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তির পথ। কিন্তু এই মুক্তির পথের বড় বাধা হচ্ছে মনের বিভ্রান্তি বা মায়া, অর্থাৎ মন হচ্ছে সকল কিছুর মূল ভিত্তি। সুতরাং মনকে জানা বা অধ্যয়ন করা জরুরী। মনকে জানার বা বোঝার দুইটি উপায় আছে, () ধ্যান অনুশীলন () দর্শন অধ্যয়নযেখানে শুণ্যতা (emptiness), জগতের সবকিছু পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল (dependent origination), চেতনাবোধ (consciousness), মধ্যমপহ্না (middle path) ইত্যাদি (Luisi, 2002) । Alan Walllace বলেন মনকে নিয়ন্ত্রনের জন্য বুদ্ধের প্রদর্শিত  নৈতিকতাগুলিও (ethics) অনুশীলন করা দরকার। নৈতিকতা ব্যাতিরেকে শুধুমাত্র ধ্যান অনুশীলনের মাধ্যমে মনকে নিয়ন্ত্রন করা যাবে না (Luisi, 2002)   

প্রকৃতির স্বাভাবিক ধর্ম বা বাস্তবতার (nature of reality) উপর ভিত্তি করে সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধ ধর্মকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথাঃ ‘অনিত্য’ (impermanence), ’অনাত্মা (soullessness)’ এবং ’দুঃখ (sorrow)’ বা সন্তুষ্টির অভাব (lack of satisfaction) (মহাস্থবির, ১৯৭৭)।

দালাই লামার মতে বৌদ্ধ ধর্ম হচ্ছে মনের বিজ্ঞান (science of mind), দর্শন (philosophy) ধর্ম (religion) (Berzin and Linden, 2003)

  • মনের বিজ্ঞানঃ আত্মবাদীমূলক জ্ঞান (subjective experience) বা অভিজ্ঞতার দৃষ্টিভঙ্গীতে কিভাবে সংজ্ঞা (perception), চিন্তাধারা (thought) এবং আবেগ (emotions) কাজ করে। ইহার আলোকে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান (neuroscience) অনেক সমৃদ্ধ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ Jon Kabat-Zinn উদ্ভাবন করেছেন Mindfulness-Based Stress Reduction (MBSR) ( Hasenkamp, 2019) 
  • দর্শনঃ যেখানে নৈতিকতা (ethics), যুক্তি (logic) এবং বৌদ্ধ ধর্মের আলোকে জগতের স্বাভাবিক বাস্তবতা বা নিয়মকে (reality) বোঝা।
  • ধর্মঃ পূর্বজম্ম এবং পুনর্জম্মে বিশ্বাস, কর্মবাদ, আনুষ্ঠানিকতা প্রার্থনা।

এখন জানা দরকার বিজ্ঞান (science), দর্শন ধর্ম কি?

বিজ্ঞান (science)ঃ ‍Science শব্দের উৎপত্তি ল্যাতিন শব্দ scientia থেকে, ইহার অর্থ জ্ঞান (knowledge) (Kishimi and Koga, 2019) বিজ্ঞান হচ্ছে জগতের নিয়ম যেভাবে আচরণ করে তা বোঝার বা জানার চেষ্টা করা। বিজ্ঞান হচ্ছে একটি ভাষা যে ভাষা দিয়ে প্রকৃতির (nature) সাথে যোগাযোগ করে বা প্রকৃতির নিয়মকে বর্ণনা করে।

দর্শন (philosophy)ঃ Philosophy এর সংজ্ঞা বা অর্থ হচ্ছে জগতকে দেখা (world view)। এই শব্দের উৎপত্তি গ্রীক শব্দ philla বা ভালবাসা sophia বা প্রজ্ঞা, অর্থাৎ প্রজ্ঞার প্রতি ভালবাসা (Kishimi and Koga, 2019) দর্শন জগতকে বিমূর্তভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে যেখানে কোন মূখ্য চরিত্র নাই (Kishimi and Koga, 2019) বারট্রান্ড রাসেল এর মতে দর্শন হচ্ছে ধর্মতত্ব বা ব্রহ্মবিদ্যা এবং বিজ্ঞানের মধ্যবর্তী এলাকাটির অধ্যয়নের ক্ষেত্র। প্লেটো মতে দর্শন হল বস্তুসত্তার জ্ঞান; দর্শন তারই জ্ঞান যা নিত্য, অপরিবর্তনীয় শাশ্বত। আ্যরিষ্টটল এর মতে দর্শন হল একটি বিজ্ঞান যা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের অস্তিত্বকে অনুসন্ধান করে। অর্থাৎ দর্শন হল একটি গুনগত বিজ্ঞান (qualitative science)।

ধর্ম (religion)ঃ ধর্ম বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে জগতকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে যেখানে ঈশ্বরই হচ্ছে মূখ্য চরিত্র বা মহানায়ক (Kishimi and Koga, 2019) অর্থাৎ ধর্ম হচ্ছে বিশ্বাস। ধর্ম হল মানুষের হিতের জন্য একটি সুসংগঠিত নীতিবাক্যের সমাহার, সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা জগতকে দেখার পথনির্দেশক (Science Daily)। 

এখন জানা দরকার সুখ (happiness) এবং মন (mind) কি?

সুখ (happiness)ঃ Happy শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে আইসল্যন্ডিক শব্দ happ থেকে, অর্থ হচ্ছে ভাগ্য বা সুযোগ (Lama and Cutler, 2009) বৌদ্ধ ধর্ম মতে চারটি বিষয়ের পরিপূর্ণতা লাভ করলে মানুষ সুখ অনুভব করবে, যথা: সম্পদ, বৈষয়িক সন্তুষ্টি, আধ্যাত্ত্বিকতা এবং বোধিজ্ঞান অর্জন (Lama and Cutler, 2009) অভিধম্মে সুখের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সুখ মানেআনন্দদায়ক অনুভূতি’, সুখ মানে দুঃখ থেকে মুক্তি, এবং নির্বান পরম সুখ (Thera, 2013, p.121)। দালাই লামার মতে, অসুখী হওয়ার মূল কারন হল যে জিনিসগুলি এবং ঘটনাগুলি আপনার কাছে ধরা দেয় যা আপনার প্রত্যাশার সাথে মেলে না। সত্যিই এটাই জীবনের বাস্তবতা। সুতরাং প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার ব্যবধানই হচ্ছে অসুখী হওয়ার মূল কারন। অতএব এই ব্যবধান যত কমবে ততই সুখী হবে। সুতরাং এই ব্যবধান কমানোর মূল ভিত্তি হচ্ছে মনকে নিয়ন্ত্রন বা মনের প্রশিক্ষণ এবং অবিদ্যা দূর করা। আ্যরিষ্টটল এর মতে সুখ হল আত্মার একটি ক্রিয়াকলাপ যা সম্পূর্ণ নিজের সদগুন প্রকাশ করে (Reeve and Miller, 2015)।

মন (mind)ঃ বৌদ্ধ ধর্ম মতে মনের কোন আকার নাই, ইহা বিমূর্ত (abstract)। এই বিমূর্ত বা অ-শরীরি (non-physical) মনই শরীরের ব্রেইন নামক অঙ্গকে (organ) নিয়ন্ত্রন করে। জড় পদার্থের কোন মন নাই, শুধুমাত্র জীবের-ই মন আছে (Louangrath, 2019)। মনের আবার কার্যকরী দিক হল মানসিক স্তর বা ফ্যাকাল্টি। মন এবং মানসিক স্তর সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা অভিধর্ম পিটকে উল্লেখিত আছে। নিম্নে সংক্ষেপে এগুলোর ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হল।

অভিধম্মে উল্লেখিত ৫২টি মানসিক স্তরঃ অভিধম্ম পিটকে এই মানসিক স্তরগুলোকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষন করা হয়েছে (Thera, 2013)। এ ৫২টি মানসিক স্তরের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণরূপে নারদ থের অনুদিত A Manual of Abhidhamma (p.65-98) গ্রহ্ন থেকে নেয়া হয়েছে।

  • সার্বজনীন (Universal, Pali: Sabbacittasadharana) মানসিক স্তর ৭টি
  • বিশেষায়িত মানসিক স্তর (Particulars, Pali: Pakinnaka) ৬টি
  • অকুশল মানসিক স্তর (Unwholesome Mental Factors, Pali: Akusala Cetasikas) ১৪টি
  • কুশল বা শোভন মানসিক স্তর (Beautiful Mental Factors, Pali: Sobhana Cetasikas) ১৯টি
  • বিরতি মানসিক স্তর (Abstinences Mental Factors, Pali: Virati) ৩টি
  • অনন্ত বা অপরিসীম মানসিক স্তর (Illimitables Mental Factors, Pali: Appamanna) ২টি
  • প্রজ্ঞা (Wisdom Mental Factors, Pali: Pannindriya) ১টি

সার্বজনীন (Universal, Pali: Sabbacittasadharana) মানসিক স্তর

ক) সার্বজনীন (Universal, Pali: Sabbacittasadharana) মানসিক স্তরঃ এই মানসিক স্তরের সংখ্যা সাতটি (৭)। প্রত্যেক জীবের বা প্রাণের মধ্যে এই ৭টি মানসিক স্তরগুলোর কোন কোনটি বা সবগুলো দেখা যায়। এই জন্য এগুলোকে সার্বজনীন  (Universal) মানসিক স্তর বলা হয়। এ ৭টি মানসিক স্তর একটির সাথে আরেকটি একসাথে ঘটতে পারে, ফলে এদের কার্যক্রম নিম্নের ক্রমানুসারে নাও ঘটতে পারে। 

দালাইলামার মতে, যেহেতু প্রত্যেক জীব বা প্রাণীর মধ্যে কম বেশী এ সার্বজনীন মানসিক স্তরগুলি বিদ্যমান  আছে সে কারনেই বৌদ্ধরা ”জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক” বাণীটি উচ্চারন করেন।

নিম্নে এই ৭টি সার্বজনীন মানসিক স্তরগুলি উল্লেখ করা হলঃ

(১) সংযোগ বা যোগাযোগ (Contact, Pali: Phasso) স্থাপন বা স্পর্শ

(২) বেদনা (Feeling, Pali: Vedana) বা অনুভূতি

(৩) সংজ্ঞা (Perception, Pali: Sanna) বা পরিচয় জানা

(৪) চেতনা (Volition, Pali: Cetana) বা কর্ম সম্পাদনের নিমিত্তে মনকে ঐ নির্দিষ্ট লক্ষ্য এর দিকে নিয়ে যাওয়া

(৫) একাগ্রতা বা লক্ষ্যটির প্রতি মনের কেন্দ্রীকরন (One pointedness, Pali: Ekaggata)

(৬) জীবিতেন্দ্রীয় বা নির্বাচিত লক্ষ্যের প্রতি মানসিক প্রক্রিয়া (Mental process, Pali: Jivitindriya)

(৭) লক্ষ্যটির উপর মনোনিবেশ করা (Attention, Pali: Manasikara)

(১) সংযোগ বা যোগাযোগ (Contact, Pali: Phasso) স্থাপন বা স্পর্শঃ যে কোন ইন্দ্রিয়ের (sense) লক্ষ্যবস্তুর প্রতি সাড়া দেওয়ার জন্য তিনটি শর্ত অপরির্হায্য যথাঃ ১) বিজ্ঞান (consciousness), ২) সংশ্লিষ্ট ইন্দ্রিয় (respective sense) এবং ৩) লক্ষ্যবস্তু বা ব্যাহ্যিক অস্তিত্ব (object)। উদাহরনস্বরূপঃ যদি কারো কাছে কোন বস্তু দৃশ্যমান হয়, এখানে বস্তুটি হচ্ছে লক্ষ্য (object), যে ইন্দ্রিয় দিয়ে বস্তুটি দৃশ্যমান হয়, সেই ইন্দ্রিয় হচ্ছে চোখ (eye sense), যে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বস্তুটি দৃশ্যমান হয় এবং সাড়া দেয় সেটি হচ্ছে বিজ্ঞান (consciousness)।

এই সংযোগ বা স্পর্শ ছয় (৬) ধরনের ইন্দ্রিয় দিয়ে হতে পারে। এই ইন্দ্রিয়গুলোকে তথ্য গ্রহনের প্রবেশদ্বার বলা যায়। যথাঃ

১) চোখ দিয়ে ব্যহ্যিক অস্তিত্বের (external object) সাথে সংযোগ হলে চক্ষু বিজ্ঞান (visual consciousness) সৃষ্টি হয়,

২) কান দিয়ে ব্যহ্যিক অস্তিত্বের সাথে সংযোগ হলে শ্রোতা বিজ্ঞান (auditory consciousness) সৃষ্টি হয়,

৩) নাক দিয়ে ব্যহ্যিক অস্তিত্বের সাথে সংযোগ হলে ঘ্রাণ বিজ্ঞান (olfactory consciousness) সৃষ্টি হয়,

৪) জিহ্বা দিয়ে ব্যহ্যিক অস্তিত্বের সাথে সংযোগ হলে জিহ্বা বা রসনা বিজ্ঞান (gustatory consciousness) সৃষ্টি হয়,

৫) ত্বক দিয়ে ব্যহ্যিক অস্তিত্বের সাথে সংযোগ হলে কায় বিজ্ঞান (tactile consciousness) সৃষ্টি হয়,

৬) মন দিয়ে ব্যহ্যিক অস্তিত্বের সাথে সংযোগ হলে মনো বিজ্ঞান (mental consciousness) সৃষ্টি হয়।

এখানে উল্লেখ করা বিশেষ প্রয়োজন যে, আ্যরিষ্টটল এর মতে ৫টি ইন্দ্রিয়, যথাঃ চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ত্বক (John, 1995)।

 

কিন্তু নিউরোসাইন্টিষ্টরা প্রকারান্তে উপরোক্ত ‘মন’ নামক ষষ্ট ইন্দ্রিয়টির অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ নিম্নে উপস্থাপন করা হল। 

নিউরোসাইন্টিষ্টদের মতে আপনি বাস্তবে যা করতে চান তা না করলেও কিন্তু মনের মাধ্যমে যদি সেই একই বিষয় কল্পনা করেন, তাহলে ব্রেইনের সেই একই জায়গাটি activate করে (Sohn, 2019)। নিম্নের ছবিটি একটি কোমা অবস্থায় non-responsive রোগী এবং সম্পূর্ণ সুস্থ volunteer দের functional magnetic resonance imaging (fMRI) স্ক্যান। কোমা রোগীকে (যার শোনার ইন্দ্রিয়টি কা্র্যকরী ছিল) বলা হল ’সে টেনিস খেলছে’ কল্পনা করতে এবং পরবর্তিতে বলা হল ’তার বাড়ির মধ্যে পায়চারি করছে কল্পনা করতে’ এবং একই বিষয়গুলি কল্পনা করতে বলা হল সুস্থ volunteer দের, উভয়দের ক্ষেত্রে ব্রেইনের একই জায়গাগুলো কা্র্যকরী দেখা যায় (নিম্নের ছবি) (Sohn, 2019)। সুতরাং এর দ্বারা প্রমানিত হয় উপরোক্ত ‘মন’ নামক ষষ্ট ইন্দ্রিয়টির অস্তিত্ব সঠিক।

 

মানসিক স্তর “স্পর্শ” কে সবার আগে স্থাপন করা হয়েছে কারন অন্য স্তরগুলি যথাঃ বেদনা, সংজ্ঞা, চেতনা ইত্যাদি ইহাকে অনুসরণ করে। 

উপরোক্ত ৬টি ইন্দ্রিয়গুলির কার্যক্রম থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, তাদের স্বাভাবিক গুনাবলী (inherent properties) ব্যহ্যিক অস্তিত্বের (external object) উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, তারা ব্যহ্যিক অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল বিধায় তাদের স্বাভাবিক গুনাবলী শূণ্য – যেটাকে নাগার্জুন পরমার্থ সত্য বা পরম সত্য (ultimate truth) বলেছেন। এই ’শুণ্যবাদ’ (emptiness) সম্পর্কে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

এখন আমরা সংক্ষেপে পরিচিত হই চিত্ত (citta), মানস (manas) এবং বিজ্ঞান (vijnana) কি। চিত্ত হচ্ছে ‘বিচারিক মন’ (judging-mind), মানস হচ্ছে ’গ্রহনকারী মন’ (receiving-mind) এবং বিজ্ঞান হচ্ছে ‘নির্বাহি মন’ (executive-mind) (Sugunasiri, 2014)। অভিধম্মে মন এবং বিজ্ঞান (consciousness) এর মধ্যে কোন পার্থক্য দেখানো হয় নাই (Thera, 2013, p.8)। বিভিন্ন দর্শনে আলোচিত এ বিষয়ের উপর গভীর বিশ্লেষনে না গিয়ে, সাধারনভাবে এ তিনটি বিষয় কি তা নিম্নে আলোকপাত করা হল। 

চিত্ত (State of Mind or Subjective Mind)ঃ পালি অভিধান মতে, চিত্ত হচ্ছে মনের গভীরতম বিষয় (heart of mind) যা মানসিক প্রক্রিয়ার গুনগত মান নির্দেশ করে। ভিক্ষু বোধি’র মতে, চিত্ত মনের মধ্যে চিন্তা, আবেগ, চেতনা’র সৃষ্টি করে। চিত্ত মনের ভিতরের একটি সংগ্রহশালা যেখানে চিন্তা, চেতনা ও আবেগ সৃষ্টি বা উৎপত্তির বীজগুলি জমে থাকে। অর্থাৎ এই সংগ্রহশালায় কুশল-অকুশল ধর্ম, বিশুদ্ধ-কলুষিত ধর্ম অবস্থান করে (Skorupski, 2014)।

মানস (Mind)ঃ মানুষের কর্ম (Karma) সৃষ্টি হয় তিনটি অস্তিত্বের মাধ্যমে যথাঃ শারীরিক কায্যক্রম দ্বারা, মনের মাধ্যমে, এবং মুখনিঃসৃত বাক্য দ্বারা যাকে বলা হয় কায়, মন, এবং বাক্য। এখানে ‘মন’ টাই হচ্ছে মানস বা মানসিক ক্রিয়া (কর্ম), এটা শারীরিক বা মৌখিক কর্মের বিপরীত।

বিজ্ঞান (Consciousness)ঃ ৬টি ইন্দ্রিয়ের (sense) মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু বা ব্যহ্যিক অস্তিত্বের (object) সাথে সংযোগ বা স্পর্শতার (contact) কারনে মনের মধ্যে যে সচেতনতার সৃষ্টি হয় তাই বিজ্ঞান। 

যখন ’চিত্তে’ অবস্থিত কুশল-অকুশল ধর্ম, বিশুদ্ধ-কলুষিত ধর্ম যার সমর্থক হিসাবে কাজ করে তাহাই ’মানস’, যখন উল্লেখিত ধর্মগুলি যার দ্বারা সমর্থিত হয় বা যার দ্বারা আশ্রিত হয় (আশ্রিতা) তাহাই ’বিজ্ঞান’ (Skorupski, 2014)। অর্থাৎ নদীর শান্ত পানি হচ্ছে ‘চিত্ত’, পানির ঢেউ (ধর্মগুলি) হচ্ছে ‘মানস’ এবং আর ঢেউগুলি যার দ্বারা সমর্থিত (ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে) হয় তা হচ্ছে ’বিজ্ঞান’।

(২) বেদনা (Feeling, Pali: Vedana) বা অনুভূতিঃ ইহা তিন ধরনের যথাঃ ভাল বেদনা, নিরপেক্ষ বেদনা ও খারাপ বেদনা। এখানে বেদনা বলতে যাতনা নয়, ইহা অনুভূতিকে বোঝানো হয়েছে। সহজ কথায় বললে, বেদনা হচ্ছে মনিব এর মতো, বাবুর্চি রান্না করবে আর উনি এর স্বাদ গ্রহন করবে। এখানে বাবুর্চি হচ্ছে স্পর্শ (contact), আর স্বাদ হচ্ছে রসনা বিজ্ঞান (gustatory consciousness) এবং ইন্দ্রিয়টির নাম হচ্ছে জিহ্বা। সরাসরিভাবে বলা যায়, কোন লক্ষ্যবস্তু বা ব্যহ্যিক অস্তিত্বের সাথে সংযোগ স্থাপন বা স্পর্শ হওয়ার পরেই অনুভূতির সৃষ্টি হবে।

(৩) সংজ্ঞা (Perception, Pali: Sanna) বা পরিচয় জানাঃ সংজ্ঞা হচ্ছে মনের মধ্যে সঞ্চিত অভিজ্ঞতালব্ধ পূর্বেকার তথ্যকে লক্ষ্যবস্তু বা ব্যহ্যিক অস্তিত্বের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে মিলিয়ে নেয়া। 

যেমন, তিনটি বোতলের মধ্যে একটিতে রক্ত, দ্বিতীয়টিতে সরবত এবং তৃতীয় বোতলটিতে পারফিউম রাখা হল। পূর্বেকার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সবাই জানি যে, রক্তের রং লাল, সরবতের স্বাদ আছে এবং পারফিউমের একটি সুগন্ধ আছে। প্রথম বোতলটি দেখার (চোখের মাধ্যমে সংযোগ) সাথে সাথে আমরা বলতে পারব এ বোতলটিতে রক্ত আছে,  দ্বিতীয় বোতলটি জিহ্বা দিয়ে স্বাদ (জিহ্বার মাধ্যমে সংযোগ) নিয়ে বলতে পারব এ বোতলটিতে সরবত আছে, এবং তৃতীয় বোতলটিতে নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিয়ে বলতে পারব এ বোতলটিতে পারফিউম আছে। এখন প্রথম বোতলটির রক্তকে বর্ণহীন, দ্বিতীয় বোতলটির সরবতকে স্বাদহীন এবং তৃতীয় বোতলটির পারফিউমকে গন্ধহীন করে অন্যজনের সামনে আনলে সে কি নির্ণয় করতে পারবে কোন বোতলের তরল পদার্থগুলি কী কী? পরীক্ষাগারে পরীক্ষা ছাড়া এদের পরিচয় নির্ণয় করা সম্ভব হবে না।

তাহলে উপরেক্ত উদাহরণ থেকে ষ্পষ্ট হল সংজ্ঞার পরিচয় অর্থাৎ মনের মধ্যে সঞ্চিত অভিজ্ঞতালব্ধ পূর্বেকার তথ্যকে লক্ষ্যবস্তু বা  ব্যহ্যিক অস্তিত্বের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে মিলিয়ে নেয়া। পাশাপাশি এটাও বোঝা গেল, স্পর্শের পরেই সংজ্ঞা। এ উদাহরণে বেদনা এবং সংজ্ঞা পাশাপাশি বলা চলে।

(৪) চেতনা (Volition, Pali: Cetana) বা কর্ম সম্পাদনের নিমিত্তে মনকে ঐ নির্দিষ্ট লক্ষ্য এর দিকে নিয়ে যাওয়াঃ   চেতনা এবং চিত্ত উভয়ই একই শব্দ ’চিত’ হতে উৎপত্তি হয়েছে। ‘চিত’ মানে হচ্ছে চিন্তা বা ভাব। এখানে চেতনার অর্থ হচ্ছে সমন্বয়সাধন করা এবং অর্জন করা। বুদ্ধঘোষের মতে চেতনা হচ্ছে ইন্দ্রিয় বিজ্ঞান হতে সৃষ্ট বিভিন্ন মানসিক স্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, একজন কাঠমিস্ত্রী তার উপর দায়িত্ব সে সম্পন্ন করার পর সে অন্য সহযোগী কাঠমিস্ত্রীর কাজও নিয়ন্ত্রন বা সমন্বয় করে। এখানে কাঠমিস্ত্রীর ভূমিকা হচ্ছে চেতনার মতো। চেতনা সকল কুশল এবং অকুশল কর্ম নিয়ন্ত্রনের প্রধান ভূমিকা পালন করে। মনোবিদ্যার দৃষ্টিতে চেতনা অনুপস্থিত, কর্মও অনুপস্থিত।

(৫) একাগ্রতা বা লক্ষ্যটির প্রতি মনের কেন্দ্রীকরন (One pointedness, Pali: Ekaggata)ঃ একাগ্রতা হচ্ছে নির্বাচিত লক্ষ্যটির প্রতি নিজের মনকে কেন্দ্রীভূত করা। যেমন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত পিলার বাতাস দ্বারা নাড়াছাড়া হবে না। সুতরাং এখানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত পিলার হচ্ছে একাগ্রতার মতন। এই মানসিক স্তর নির্বাচিত লক্ষ্যটির প্রতি মনের শতভাগ কেন্দ্রীকরনের লক্ষ্যে অন্যান্য মানসিক স্তরগুলিকে বাধা প্রদান করে।

(৬) জীবিতেন্দ্রীয় বা নির্বাচিত লক্ষ্যের প্রতি মানসিক প্রক্রিয়া (Mental process, Pali: Jivitindriya)ঃ যাকে একাগ্রতা দিয়ে প্রভাবিত করে। এখানে ‘জীবিতা’ অর্থ হচ্ছে জীবন বা প্রান এবং ‘ইন্দ্রীয়া’ অর্থ হচ্ছে নিয়ন্ত্রনকারী ইন্দ্রিয়গুলি। এই মানসিক স্তর উভয় মানসিক (psychic or mind) এবং শারীরিক (physical or matter) কাঠামোকে প্রাণসঞ্চার করে। পদ্মফুল যেমন পানির মধ্যে বেচেঁ থাকে, শিশুকে যেমন মা সেবা শুশ্রুষা করে বড় করে। অতএব, এখানে পদ্মফুল ও শিশু হচ্ছে ‘জীবিতা’ এবং পানি ও মা হচ্ছে ইন্দ্রীয়া। সুতরাং জীবিতেন্দ্রীয় যেমন মানসিক (mind) ও ভৌত (matter) কাঠামোর উপর ‍নির্ভরশীল, তেমনি মানসিক ও ভৌত কাঠামোও জীবিতেন্দ্রীয়ের উপর নির্ভরশীল।

(৭) লক্ষ্যটির উপর মনোনিবেশ করা (Attention, Pali: Manasikara)ঃ অর্থাৎ এই মানসিক স্তরে মন একমাত্র লক্ষ্যবস্তু বা ব্যাহ্যিক অস্তিত্বকে (object) ফোকাস করে। মনসিকার বা Attention হচ্ছে জাহাজের রাডার এর ন্যায় যা জাহাজকে গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়। মনসিকার ব্যাতীত মন রাডারহীন জাহাজের মতো।

বিশেষায়িত মানসিক স্তর (Particulars, Pali: Pakinnaka)

খ) বিশেষায়িত মানসিক স্তর (Particulars, Pali: Pakinnaka)ঃ এই বিশেষায়িত মানসিক স্তরের সংখ্যা ৬টি। বিশেষ বা নির্দিষ্ট শ্রেনীর বিজ্ঞানে (consciousness) এই মানসিক স্তরগুলি দেখা যায়। 

একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার আগে বা পূর্বে মনের মধ্যে যে মানসিক স্তরের ধারাবাহিক বিন্যাস ঘটে – এ গুলিই হচ্ছে বিশেষায়িত মানসিক স্তর। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে যে কোন কাজ করার পূর্বে এ ছয়টি মানসিক স্তর আমাদের মনের মধ্যে কার্যকরী ঘটে। কুশল এবং অকুশল উভয় ক্ষেত্রেই এই মানসিক স্তরগুলি কাজ করে। নিম্নে এই বিশেষায়িত মানসিক স্তরগুলি উল্লেখ করা হলঃ

১) প্রাথমিক আবেদন (Initial application, Pali: Vitakka)

২) টেকসই আবেদন (Sustained application, Pali: Vicara)

৩) সিদ্ধান্ত বা দৃঢ়সংকল্প (Decision, Pali: Adhimokkha)

৪) প্রচেষ্টা (Effort, Pali: Viriya)

৫) উৎসাহ (Source of pleasure, Pali: Piti)

৬) কার্যকরী করার ইচ্ছা (Conation or will to perform an action, Pali: Chanda)

 

১) প্রাথমিক আবেদন (Initial application, Pali: Vitakka)ঃ পালি শব্দ vitakka অর্থ ধারণা করা। যখন মনের মধ্যে কোন লক্ষ্যের প্রতি প্রাথমিক ধারণার উৎপত্তি এবং ইহা লালন করা হয়। পরবর্তীতে ইহাই মনের মধ্যে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এবং অবিচলভাবে মনে প্রাথমিক ধারণাটি স্থায়িত্ব লাভ করে। মনের মধ্যে ইহা সাদামাটাভাবে একটি জায়গা করে নেয়।

ফলে মনের মধ্যে প্রোথিত প্রাথমিক ধারণাটি মনের অলসতা ও নিস্ক্রিয়তাকে দূরে সড়িয়ে দেয়।

২) টেকসই আবেদন (Sustained application, Pali: Vicara)ঃ টেকসই আবেদন হল মনের মধ্যে প্রোথিত লক্ষ্যের প্রতি  প্রাথমিক ধারণাটিকে অবিচ্ছিন্নভাবে অনুশীলন করা। এই মানসিক স্তরের প্রধান বৈশিস্ট্য হচ্ছে ধারণাটিকে ক্রমাগত পরীক্ষা বা বিচার করা।

নিম্নে উদাহরণের মাধ্যমে প্রাথমিক আবেদন (vitakka) এবং টেকসই আবেদন (vicara) এর পার্থক্য প্রদান করা হলঃ

একটি মৌমাছি যখন একটি পদ্মফুলকে আলোকিত করে, এখানে আলোকিত করাটিই হচ্ছে vitakka বা প্রাথমিক আবেদন। আলোকিত করার প্রেক্ষিতে মৌমাছি যখন পদ্মফুলের চারপাশে ঘুরতে থাকে বা ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা করে, এখানে ঘুরতে থাকা বা পরীক্ষা করাটাই হচ্ছে vicara বা টেকসই আবেদন।

এই মানসিক স্তরে মনের যে কোন সন্দেহ বা সিদ্ধান্তহীনতাকে দূরে সড়িয়ে দেয়।

৩) সিদ্ধান্ত বা দৃঢ়সংকল্প (Decision, Pali: Adhimokkha)ঃ পালি শব্দ adhimokkha এর আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে মুক্তির আগে। এই মানসিক স্তরে লক্ষ্যবস্তুটির প্রতি মনকে ধাবিত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জন্য, যা সন্দেহ বা সিদ্ধান্তহীনতার বিপরীত। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এমনভাবে যে, শুধু লক্ষ্যটি ’এটাই’ অর্থাৎ লক্ষ্যটির প্রতি অটল।

৪)  প্রচেষ্টা (Effort, Pali: Viriya)ঃ প্রচেষ্টা হচ্ছে একজন কর্মক্ষম ব্যাক্তির কর্মকান্ডের মতো। লক্ষ্যটির প্রতি সিদ্ধান্তে অটল থাকার পর এটাকে সমর্থন করাই হচ্ছে প্রচেষ্টার কাজ। Viriya কে ইন্দ্রিয় সমুহের নিয়ন্ত্রনকারী ফ্যাক্টর বলা হয় যা ইন্দ্রিয়ের অলসতাকে পরাস্ত করে। Atthasālini তে বলা হয়েছে যে, viriya হচ্ছে সকল অর্জনের মূল মানসিক স্তর।

৫) উৎসাহ (Source of pleasure, Pali: Piti)ঃ শুধু মনের মধ্যে ’প্রচেষ্টা’ লালন করলে হবে না ’উৎসাহ’ও থাকতে হবে।

 

৬) কার্যকরী করার ইচ্ছা (Conation or will to perform an action, Pali: Chanda)ঃ এই স্তরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করার ইচ্ছা, অর্থাৎ লক্ষ্যকে ধরার জন্য হাতকে প্রসারিত করার মতন।

এই মানসিক স্তরে তিন ধরনের ‘ইচ্ছা’র কথা বলা হয়েছে, যথাঃ 

ক) কাম ইচ্ছাঃ এই ইচ্ছা ইন্দ্রিয় তৃষ্ণার কারনে সৃষ্টি হয়। সাধারনত ইহা অনৈতিক ক্যাটাগরীতে পরে 

খ) কেবলই ইচ্ছাঃ এই ইচ্ছাটিও অনৈতিক ক্যাটাগরীতে পরে

গ) ন্যায়নিষ্ঠ বা পবিত্র ইচ্ছাঃ যত কুশল কর্ম সম্পাদন করা হয় তা এই ন্যায়নিষ্ঠ ইচ্ছার কারনেই হয়। এই ইচ্ছার কারনেই প্রিন্স সিদ্ধার্থ যেমন রাজকীয় সুখ বিসর্জন দিয়ে জগতের সুখের উপায় খোঁজার জন্য সংসার ত্যাগ করেছিলেন। 

অকুশল মানসিক স্তর (Unwholesome Mental Factors, Pali: Akusala Cetasikas)

৫২টি মানসিক স্তরের (mental States) মধ্যে ১৪টি মানসিক স্তরকে অকুশল মানসিক স্তর হিসাবে দেখানো হয়েছে। এই অকুশল মানসিক গুনাবলীর কারনে মানুষ অসুখী হয়।

১) মায়া বা মোহ বা অবিদ্যা (Delusion or ignorance, Pali: Moha)

২) অবিনয়ী (Shamelessness, disrespect, Pali: Ahirika)

৩) নিঃশঙ্কতা (Fearlessness, to commit wrong, Pali: Anottappa)

৪) অস্থিরতা বা চঞ্চলতা (Restlessness, Pali: Uddhacca)

৫) আনুগত্য (Attachment, Pali: Lobha)

৬) ভ্রান্ত বিশ্বাস বা ধারনা (Misbelief, Pali: Ditthi)

৭) অহমিকা বা দেমাক (Conceit, Pali: Mana)

৮) ঘৃণা বা দোষ (Hatred, Pali: Dosa)

৯) ঈর্ষা (Jealousy, Pali: Issa

১০) অর্থলিপ্সা বা কৃপনতা (Avarice, Pali: Macchariya)

১১) উদ্বেগ বা সংশয় (Worry, Pali: Kukkucca)

১২) অলসতা বা ঢিলামি (Sloth, Pali: Thina)

১৩) অস্পষ্টতা বা নিষ্ক্রিয়তা (Torpor, Pali: Middha)

১৪) সন্দেহ বা অবিশ্বাস বা দ্বিধা (Doubt, Pali: Vicikiccha)

 

১) মায়া বা মোহ বা অবিদ্যা (Delusion or ignorance, Pali: Moha)ঃ মোহ মনের তিন ধরনের ক্লেশ এর একটি, অন্য দুটি হচ্ছে লোভ এবং দ্বেষ। মোহ এর প্রধান বৈশিস্ট্য হচ্ছে লক্ষ্যবস্তুর প্রকৃতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি। ইহা নিজের কর্ম ও কর্মফল সম্পর্কিত ধারনা এবং জ্ঞানকে আচ্ছাদিত করে বা ঢেকে রাখে।

 

২) অবিনয়ী (Shamelessness, disrespect, Pali: Ahirika)ঃ যে খারাপ বা অশুভ কাজ করার পরও লজ্জিত না হয়। যে নূন্যতম অনুশোচনা ছাড়াই খারাপ বা মন্দ কাজ করবে।

 

৩) নিঃশঙ্কতা (Fearlessness, to commit wrong, Pali: Anottappa)ঃ পালিতে ইহাকে বলা হয় ‘অনুত্তাপ’। যে ফলাফল সম্পর্কে ধারনা ব্যতিরেকে কোন খারাপ বা মন্দ কাজ করে এবং পরিণতিতে হতাশা বা দুঃখে ভোগে বা শাস্তি প্রাপ্ত হয়।

 

৪) অস্থিরতা বা চঞ্চলতা (Restlessness, Pali: Uddhacca)ঃ পালি uddhacca শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘ঝাঁকুনি দেওয়া’। এই পালি শব্দটি মনের অস্থিরতা অর্থেও ব্যবহৃত হয়। একটি ছোট পাথরকে ছাইয়ের গাদার মধ্যে নিক্ষেপ করলে ছাইয়ের স্তূপের যে অস্থির অবস্থার সৃষ্টি হয়, মনের অস্থিরতা নামক এই অকুশল কর্মের মানসিক স্তরটি ছাইয়ের স্তূপের অস্থির অবস্থার ন্যায়।

 

৫) আনুগত্য (Attachment, Pali: Lobha)ঃ তৃষ্ণা, লোভ বা লালসার প্রতি আনুগত্য বা তীব্র আকাঙ্খা। বিবেকবর্জিতভাবে বা আবেগতাড়িত হয়ে বা অতি ভক্তির কারনে বাছবিচারহীনভাবে অন্যের মতামতকে সমর্থন করা।

 

৬) ভ্রান্ত বিশ্বাস বা ধারনা (Misbelief, Pali: Ditthi)ঃ এ মানসিক স্তর সাধারনভাবে মিথ্যা দৃষ্টির পর্যায়ে পড়ে। যদি কারো দৃষ্টিভঙ্গিটা হয় এমন যে, আমারটা সত্যিই সঠিক কিন্তু অন্যদেরটা ভুল। অর্থ্যাৎ ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারনে বাস্তবতাকে প্রত্যাখ্যান করে।

 

৭) অহমিকা বা দেমাক (Conceit, Pali: Mana)ঃ অহমিকা বা দেমাক বা দম্ভ বা দাম্ভিকতা করাও একটি অকুশল কর্ম। দম্ভ আবার তিন ধরনের হয় যথাঃ (ক) আমি তার সমান এই বলে দম্ভ বা অহমিকা করা, (খ) আমি তার চাইতে নিকৃষ্ট তা মনে করা বা হীনমন্যতায় ভোগা, এবং (গ) শ্রেষ্ঠত্ব বা টেক্কা দেওয়ার দম্ভ। এই অকুশল চিন্তার কারনে আমরা নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করি, যা উচিত নয়।

 

৮) ঘৃণা বা দোষ (Hatred, Pali: Dosa)ঃ এই মানসিক স্তরটি ধংসাত্মক ধরনের, ইহা বড়ই কুৎসিত। এটা দিয়ে যে কাউকেই আহত করা যায়। এই ঘৃণা বা দোষের কারনে নিজেকে বা এর আশপাশকে কলুষিত বা ধ্বংস করে। এই অকুশল কর্মটির কারনে যে কোন খারাপ ও অমানবিক কাজ করা যেতে পারে। এই ঘৃণা বা দোষ নামক অপগুনটি শরীর ও মনের জন্যও ক্ষতিকারক। যখন কারো মনে ’দোষ’ নামক অপগুনটি কাজ করে তার মুখাবয়বটি রক্তাব হয়, এবং সবকিছুই নিরানন্দময় মনে হয়। 

 

৯) ঈর্ষা (Jealousy or Envious, Pali: Issa)ঃ এই অকুশল কর্মটির কারনে অন্যের সফলতা এবং উন্নতির জন্য নিজের মনে অন্তর্দাহ হয়। ইহা নির্ভর করে অন্যের বিষয়াগত (objectivity) কারনে।

 

১০) অর্থলিপ্সা বা কৃপনতা (Avarice, Pali: Macchariya)ঃ এই অপগুনটির কারনে নিজের অধিকারে থাকা এবং অন্যান্য বস্তুগত সম্পত্তিকে সদব্যবহার করতে সমর্থ হয় না। সে তার অংশীদারিমূলক সম্পত্তিগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকার কারনে অন্যের সাথে ভাগ করে নিতে অনাগ্রহী হয় ফলে অন্যের সাথে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। এজন্য কৃপনতাকে একটি মানসিক কুৎসিততা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ইহা সম্পূর্ণ নিজের বিষয়াগত (subjectivity) কারনে প্রভাবিত।

 

১১) উদ্বেগ বা সংশয় বা বিভ্রান্তি (Worry, Pali: Kukkucca)ঃ যে মন্দ কাজটি করা হয়েছে তার জন্য অনুশোচনা এবং ঐ একই বিষয়ে ভালো কাজটি না করার জন্যও অনুশোচনা। যেমন একজন কাউকে মন্দ বলে গালি দিল, গালি দেওয়ার পর সে অনুশোচনা করতে লাগল কেন সে অন্যকে গালি দিল। আবার মনের মধ্যে অনুশোচনার উদয় হলো কেন সে ঘটনার পর ক্ষমা চায়নি। এই ধরনের বিভ্রান্তিও এক ধরনের অকুশল গুণাবলী।

 

১২) অলসতা বা ঢিলামি (Sloth, Pali: Thina)ঃ ভিক্ষু বোধি’র মতে অলসতা মানে মনের মধ্যে চালিকাশক্তির অভাব। আলস্যতা বা মনের নিস্তেজতা এই মানসিক স্তরের প্রধান বৈশিস্ট্য। এই অকুশলতা মনের ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে ফেলে, যা মনকে অতল গভীরে নিয়ে যায়।

 

১৩) অস্পষ্টতা বা নিষ্ক্রিয়তা (Torpor, Pali: Middha)ঃ নিস্ক্রিয়তা, জড়তা এবং অক্ষমতা বা মনমরা অবস্থা এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। কর্মবিমুখতা, বোধগম্যহীনতা, নিস্তেজতা, নিজেকে অপরের থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা, নিজেকে নিজের ভিতরে আবদ্ধ করে রাখা, এগুলো হলো মনের নিষ্ক্রিয়তা। অলসতা এবং নিস্ক্রিয়তা এই মানসিক অকুশলদ্বয় খুব কাছাকাছি।   

 

১৪) সন্দেহ বা অবিশ্বাস বা দ্বিধা (Doubt, Pali: Vicikiccha)ঃ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ’এটা যে এমন হয়’ এই বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অক্ষমতা। চোগিয়াম থ্রোঙ্গপা এর মতে সন্দেহ বা অবিশ্বাস হচ্ছে যিনি অন্যের মতকে অবিশ্বাস করে এবং অন্যদের উপদেশের প্রতি অবিশ্বাস বা সন্দেহ, যিনি শিক্ষকদের শিক্ষাদান সম্পর্কে আস্থাহীন, ধর্ম সম্পর্কে দ্বিধা এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক অস্তিত্ব সম্পর্কে দ্বিধা। থেরবাদী পন্ডিত নিনা-ভন-গোরকোম এর মতে বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা, কার্য-কারণ সম্পর্কে দ্বিধা, চতুরায্য সম্পর্কে দ্বিধা, জগতের সবকিছু পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল  (dependent origination) এই সত্য সম্পর্কে দ্বিধা।

যদি নিয়মিত ধ্যান অনুশীলন করে উপরোক্ত ১৪টি অকুশল মানসিক ফ্যাকাল্টি কারো স্বভাব থেকে দূর করতে পারে তাহলে মানসিক চাপ ও হতাশাজনক মানসিক রোগ (stress and depression) ঔষধ সেবন ছাড়াই কার্যকরভাবে সেরে যাবে (Louangrath, 2019)।

কুশল বা শোভন মানসিক স্তর (Beautiful Mental Factors, Pali: Sobhana Cetasikas)

৫২টি মানসিক স্তরের (mental states) মধ্যে ১৯টি মানসিক স্তরকে কুশল বা শোভন মানসিক স্তর হিসাবে দেখানো হয়েছে।

১)  শ্রদ্ধা বা প্রত্যয় বা অসংশয় (Confidence, Pali: Saddha)

২) মনোযোগিতা বা স্মৃতিকে বিকশিত করা (Mindfulness, Pali: Sati)

৩) লজ্জিত (শোভনীয় অর্থে) (Shame from the viewpoint of Moral, Pali: Hiri)

৪) ভয় (শোভনীয় অর্থে) (Dread from the viewpoint of Moral, Pali: Ottapa)

৫) আনুগত্যহীনতা (Non-attachement, Pali: Alobha)

৬) দয়া বা মঙ্গল কামনা (Goodwill, Pali: Adoso)

৭) উপেক্ষা (Equanimity, Pali: Upekkha or Tatramajjhattata)

৮) মানসিক স্তরের প্রশান্তি (Tranquality of mental states, Pali: Kaya-passaddhi)

৯) মনের প্রশান্তি (Tranquality of mind, Pali: Citta-passaddhi)

১০) মানসিক স্তরের হালকা ভাব (Lightness of mental states, Pali: Kaya-lahuta)

১১) মনের হালকা ভাব (Lightness of mind, Pali: Citta-lahuta)

১২) মানসিক স্তরের নম্রতা (Pliancy of mental states, Pali: Kaya-muduta)

১৩) মনের নম্র ভাব (Pliancy of mind, Pali: Citta-muduta)

১৪) মানসিক স্তরের অভিযোজন (Adaptability of mental states, Pali: Kaya-kammannata)

১৫) মনের অভিযোজন (Adaptability of mind, Pali: Citta-kammannata)

১৬) মানসিক স্তরের দক্ষতা (Proficiency of mental states, Pali: Kayapagunnata)

১৭) মনের দক্ষতা (Proficiency of mind, Pali: Citta-pagunnata)

১৮) মানসিক স্তরের ন্যায়পরণতা (Rectitude of mental states, Pali: Kayujjukata)

১৯) মনের ন্যায়পরণতা (Rectitude of mind, Pali: Cittujjukata)

 

উপরোক্ত মানসিক ফ্যাক্টরগুলোতে দেখা যায়, ৮ থেকে ১৯ পর্যন্ত শোভনীয় গুনাবলী দুইবার ব্যবহার করা হয়েছে, যথাঃ mind (citta) এবং mental states (mental factors) এর ক্ষেত্রে।

গেসে তাসি শেরিং এর মতে mind (citta) হচ্ছে সিনেমার ’পর্দার’ মতো যেখানে ছবি প্রদর্শিত হয় এবং mental states (mental factors, Pali: kaya) হচ্ছে সিনেমার ’ছবির’ মতো। সিনেমা দেখার সময় ছবির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষিত হয় বেশী কিন্তু যে পর্দায় ছবিগুলো দেখানো হয় সে পর্দার প্রতি মনোযোগ তেমন আকর্ষিত হয় না। অর্থাৎ মন (mind) সামগ্রিক (পর্দা এবং ছবি) বস্তুর উপস্থিতি টের পায় এবং মানসিক ফ্যাক্টর (mental factors or states, Pali: kaya) শুধুমাত্র বা বিশেষ বস্তুর (ছবি) প্রতি সচেতন হয়। অন্যভাবে বলা যায়, এখানে পালি শব্দ ‘কায়া’ বলতে বস্তুগত শরীর নয়, ইহা অর্থ মানসিক ফ্যাক্টর যথাঃ বেদনা (feeling), সংজ্ঞা (perception), এবং সংস্কার (mental formation)। আর ‘চিত্ত’ কে বুঝায় মন বা বিজ্ঞান (consciousness)। উভয় ‘মানসিক স্তর’ এবং ‘মন’ একসাথে উৎপত্তি হয় এবং একইসাথে কাজও করে।

১)  শ্রদ্ধা বা প্রত্যয় বা অসংশয় (Confidence, Pali: Saddha)ঃ এই মানসিক স্তরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মনের ’পরিশুদ্ধতা’। যেমনঃ ময়লা পানিতে ফিটকিরি দিলে ময়লা পানি যেমন বিশুদ্ধ হয়ে যায় তেমনি ’শ্রদ্ধা’ অকুশল মনকে পরিশুদ্ধ করে। অট্টশালীনি গ্রন্থে ইহাকে বলা হয় মনের সকল কুশলতার বা বিশুদ্ধতার অগ্রদূত।

 

২) মনোযোগিতা বা স্মৃতিকে বিকশিত করা (Mindfulness, Pali: Sati)ঃ ইহা একটি মনের শোভনীয় বা কুশল গুনাবলী। এটার সহজ অর্থ হচ্ছে স্মৃতির উন্নয়ন ঘটান বা বিকশিত করা যাতে যখন দরকার হয় সহজে ইহাকে রোমন্থন করতে পারবে। সতিপট্ঠান সূত্রে বিশদভাবে উল্লেখ করা আছে কিভাবে স্মৃতিকে বিকশিত করা যায়। যাঁদের স্মৃতি চূড়ান্তভাবে ইতিমধ্যে বিকশিত হয়েছে তাঁরা নাকি পূর্বজম্মের স্মৃতিকে স্মরণ করতে পারে। এটা আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গের একটি মার্গ বা পথ। 

Mindfulness-Based Stress Reduction (MBSR) এর উদ্ভাবনকারী Jon Kabat-Zinn এর মতে mindfulness হচ্ছে, ইহা একটি সচেতনতা যা অর্জিত হয় গভীর মনোযোগের মাধ্যমে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে, মনকে বর্তমান মুহূর্তের মধ্যে নিবিষ্ট করে এবং বিচারহীনভাবে।    

 

৩) লজ্জিত (শোভনীয় অর্থে) (Shame from the viewpoint of Moral, Pali: Hiri)ঃ এই গুনের সমতুল্য শব্দ হচ্ছে আত্মসম্মান বা আত্মমর্যাদা এবং সুবুদ্ধি বা বিবেকবান বা ন্যায়বান। যে বিষয়টি আপত্তিজনক তা পরিত্যাগ করা, অর্থাৎ অপবিত্র কাজ থেকে বিরত থাকা। যদিও খারাপ বা অকুশল কাজ করা হয় তার জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে লজ্জিত হওয়া।

 

৪) ভয় (শোভনীয় অর্থে) (Dread from the viewpoint of Moral, Pali: Ottapa)ঃ অন্যের দৃষ্টিতে আপত্তিজনক কোন কাজ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। ভালো চরিত্রের লোকেরা যাতে আপনাকে নিন্দা না করে সে সমস্ত অকুশল কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখা। 

 

৫) আনুগত্যহীনতা (Non-attachement, Pali: Alobha)ঃ তৃষ্ণা, লোভ বা লালসার প্রতি আনুগত্যহীনতা। নিঃস্বার্থভাবে দান করা এবং পরার্থপরতা বা অন্যের উপকার করা – এ সমস্ত গুনাবলীর অনুশীলন এর মাধ্যমে এই শোভনীয় মানসিক স্তরের উন্নয়ন ঘটানো। পদ্মপাতার মধ্যে জলের কণা পড়লে কণাটি যেমন পাতার মধ্যে লেগে না থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়, তেমনি পরার্থপরতা বা দানশীলতা অনুশীলন করলে মনের মধ্যে তৃষ্ণা, লোভ বা লালসা রেখাপাত করবে না বা লেগে থাকবে না। সুতরাং ‘আনুগত্যহীনতা (alobha)’ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তৃষ্ণা, লোভ বা লালসা মনের মধ্যে লেগে না থাকা।

আবেগ এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, যাচাই বাচাইয়ের মাধ্যমে যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া – এজন্য ‘কালামা সূত্র’ থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়।

 

৬) দয়া বা মঙ্গল কামনা (Goodwill, Pali: Adosa or metta)ঃ মনের মধ্যে সর্বদা দয়া বা মঙ্গল চিন্তা করলে ঘৃণা বা দোষ অপসৃত হবে। পালি adosa শব্দের একার্থ শব্দ হচ্ছে mettā বা মৈত্রী। সুতরাং সর্বদা মৈত্রী কামনা করা এই মানসিক গুনাবলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। মনের মধ্যে মৈত্রীভাব এর উন্নয়ন ঘটানোর জন্য ‘করণীয় মৈত্রী সূত্রে (Buddha’s Words on Loving-Kindness)’ ও ‘মৈত্রী ভাবনা সুত্র’এ উল্লেখিত নির্দেশনাবলী অনুশলীন করা যায়।  

এ গুনাবলীটি মনের তিনটি কুশল বা ভাল গুনাবলীর অন্যতম একটি। অন্য দুটি হচ্ছে ‘আনুগত্যহীনতা (alobha)’ এবং অমোহ (amoha) বা প্রজ্ঞা। ‘আনুগত্যহীনতা (alobha)’ সম্পর্কে উপরে আলোচনা করা হয়েছে। যেহেতু ’অমোহ’ অর্থ প্রজ্ঞা (wisdom) শব্দের অর্থের কাছাকাছি, সুতরাং ‘অমোহ’ কে এই ১৯টি শোভনীয় মানসিক গুনাবলীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নাই। প্রজ্ঞা (Wisdom) হচ্ছে ৫২টি মানসিক স্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ ধাপ যা পরে আলোচনা করা হবে। 

 

অতএব, এক কথায় উপরোক্ত তিনটি ভাল গুনাবলীর মূল ভিত্তি হচ্ছে, অলোভ (alobha) মানে ’দান’, অদোষ (adosa)মানে ‘শীল’, এবং অমোহ (amoha) মানে ‘ভাবনা’। সচরাচর সবাই প্রাত্যাহিক জীবনে কুশল কর্ম সম্পাদনের জন্য দান-শীল-ভাবনা অনুশীলন করে।

 

৭) উপেক্ষা (Equanimity, Pali: Upekkha or Tatramajjhattata)ঃ এই মানসিক স্তরের প্রধান বৈশিস্ট্য হচ্ছে সবকিছুর প্রতি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। রথচালক যেমন উভয় ঘোড়াকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে, তেমনি উপেক্ষা’র মর্মার্থ হচ্ছে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। এই শব্দের আরেকটি অর্থ হচ্ছে ‘যেতে দাও’। অর্থাৎ মনের মধ্যে বিরূপভাব পোষন না করে একে এড়িয়ে যাওয়া বা ভুলে যাওয়া।

 

৮) মানসিক স্তরের প্রশান্তি (Tranquality of mental states, Pali: Kaya-passaddhi) এবং ৯) মনের প্রশান্তি (Tranquality of mind, Pali: Citta-passaddhi)ঃ passaddhi শব্দের বাংলা অর্থ প্রশান্তি, অব্যাকুলতা, নিস্তদ্ধতা, পবিত্রতা। এই গুনাবলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মনের আবেগের উত্তপ্ততাকে দমন করা বা হ্রাস করা। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে পথচারী যেমন গাছের ছায়ার নীচে আশ্রয় নিয়ে প্রশান্তি নেয়, তেমনি passaddhi বা প্রশান্তি মনের আগুনকে নিবিয়ে দেয়। যারা এই গুনাবলীর দক্ষতা অর্জন করবে, তারা তাদের বোধিজ্ঞান (enlightenment) অর্জনের পথকে সুগম করবে। এই প্রশান্তি গুনাবলী দুই ক্ষেত্রে হয়, যথাঃ কায়া (kaya) এবং চিত্ত (citta)। এদের পার্থক্য আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। 

 

১০) মানসিক স্তরের হালকা ভাব (Lightness of mental states, Pali: Kaya-lahuta) এবং ১১) মনের হালকা ভাব (Lightness of mind, Pali: Citta-lahuta)ঃ পালি শব্দ lahuta’র উৎপত্তি লঘু (laghu) থেকে অর্থাৎ হালকা, যেমনঃ পানিতে ভেসে থাকার মতো। এই গুনাবলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানসিক স্তর এবং মন এর ভারী হওয়াকে নিরোধ বা দমন করা। এটা অলসতা এবং মনমরা অবস্থার বিপরীত।

 

১২) মানসিক স্তরের নম্রতা (Pliancy of mental states, Pali: Kaya-muduta) এবং ১৩) মনের নম্র ভাব (Pliancy of mind, Pali: Citta-muduta)ঃ এই গুনাবলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ’মানসিক স্তর’ এবং ’মন’ এর কঠোরতা দমন। অর্থাৎ এ গুনাবলী কঠোরতা দমন করে ’মানসিক স্তর’ এবং ’মন’কে এমনভাবে নরম বা কোমল করে যাতে ব্যহ্যিক তথ্যকে অতি সহজে গ্রহন করা যায়। শরীরের ত্বককে তৈল বা পানি দিয়ে মালিশ করে যেভাবে ত্বককে কোমল করে, এই গুনাবলীর কাজও তেমন। এটা মিথ্যাদৃষ্টি এবং অহমিকা বা দেমাক এর বিপরীত যেগুলো কাঠিন্যতা সৃষ্টির কারন।

 

১৪) মানসিক স্তরের অভিযোজন (Adaptability of mental states, Pali: Kaya-kammannata) এবং ১৫) মনের অভিযোজন (Adaptability of mind, Pali: Citta-kammannata)ঃ এখানে kammannata এর শব্দের অর্থ হচ্ছে ’কার্যপযোগিতা’ অর্থাৎ কাজ করার মতো উপযোগি করে তোলা এবং ’সেবাযোগ্যতা’ অর্থাৎ সেবা করার মতো উপযোগি করে তোলা। এই গুনাবলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ’মানসিক স্তর’ এবং ’মন’ এর অ-কার্যপযোগিতা এবং অ-সেবাযোগ্যতা দমন বা নিরোধ করা যাতে নিজেকে অভিযোজন করা যায়। উদাহরনস্বরূপ বলা যায়, ধাতব পদার্থকে এমনভাবে উত্তপ্ত করা হয় যাতে এটিকে সকল জায়গায় খাপ খাওয়ানো যায়। 

 

১৬) মানসিক স্তরের দক্ষতা (Proficiency of mental states, Pali: Kayapagunnata) এবং ১৭) মনের দক্ষতা (Proficiency of mind, Pali: Citta-pagunnata)ঃ এটি ’মানসিক স্তর’ এবং ’মন’এর দক্ষতা। এই গুনাবলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ’মানসিক স্তর’ এবং ’মন’এর দূর্বলতা বা অসুস্থতাকে দমন বা নিরোধ করা। এই গুনাবলী উভয় ’মানসিক স্তর’ এবং ’মন’কে যথাযথভাবে কাজ করতে সহায়তা করে।

 

১৮) মানসিক স্তরের ন্যায়পরণতা (Rectitude of mental states, Pali: Kayujjukata) এবং ১৯) মনের ন্যায়পরণতা (Rectitude of mind, Pali: Cittujjukata)ঃ এই গুনাবলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সরলতা বা ন্যায়পরনতা। অর্থাৎ ইহা অসাধুতা, প্রতারণা এবং কূটকৌশল বিরোধী।

 

উপরোক্ত ১৯টি মানসিক গুনাবলী সকল ধরনের কুশল বা শোভনীয় বা নৈতিক বিজ্ঞান (consiousness) এ সার্বজনীনভাবে বিদ্যমান।

’বিরতি’ মানসিক স্তর (Abstinences Mental Factors, Pali: Virati)

৫২টি মানসিক স্তরের (mental states) মধ্যে ৩টি মানসিক স্তরকে ’বিরতি’ মানসিক স্তর হিসাবে দেখানো হয়েছে।

 

’বিরতি’ মানসিক স্তর তিন ধরনের, যথাঃ

১)  সম্যক বাক্য (Right Speech, Pali: Samma-vaca)

২) সম্যক কর্ম (Right Action, Pali: Samma-kammanto)

৩) সম্যক জিবীকা (Right Livelihood, Pali: Samma-ajivo)

 

বিরতি মানে বিরত থাকা, ও আনন্দিত। অট্টশালীনিতে তিন ধরনরে বিরতি’র কথা উল্লেখ আছে, যথাঃ সমপত্থ বিরতি, সমাধান বিরতি এবং সমুচ্ছেদা বিরতি।

 

সমপত্থ বিরতিঃ কারো জম্ম, বয়স, শিক্ষা ইত্যাদি উৎপত্তির ঘটনা বিবেচনায় নিয়ে নিজেকে অশুভ বা মন্দ চিন্তা থেকে বিরত থাকা।

 

সমাধান বিরতিঃ অন্যের শীল পালন বিবেচনায় নিয়ে মন্দ চিন্তা থেকে বিরত থাকা। উদাহরনস্বরূপ বলা যায়, একজন ধার্মিক হত্যা, চুরি ইত্যাদি থেকে বিরত থাকে যেহেতু সে ’হত্যা না করা’ শীল পালন করে।

 

সমুচ্ছেদা বিরতিঃ যে ধার্মিক ব্যাক্তি মন্দ বা অশুভ চিন্তা সম্পূর্ণরূপে নির্মুল করতে পারে, যেমন অরহত স্তরের ধার্মিকবৃন্দ। অরহত অর্জনকারী ধার্মিকবৃন্দরাই অন্যায় বাক্য, অন্যায় কাজ এবং অন্যায় জীবিকা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। 

 

দৃঢ়ভাবে বলতে হয় এই তিন ধরনের মানসিক গুনাবলী অর্জনের ফলে সমন্বিতভাবে লোকত্তর চিত্তের (বস্তুগত পার্থিব জগতের চেয়েও উচ্চতর জগত) সৃষ্টি করে।

 

১)  সম্যক বাক্য (Right Speech, Pali: Samma-vaca)ঃ সম্যক বাক্য সম্পর্কে বলা হয়েছে ’অভয়া সূত্রে (Abhaya Sutta, MN 58)। সংক্ষেপে বলা যায়, তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে সম্যক বাক্য গঠিত যথাঃ আপনার বাক্যটি সঠিক কিনা, আপনি যাকে বা যাদেরকে বলছেন তার বা তাদের উপকার হচ্ছে কিনা, এবং আপনি যাকে বা যাদেরকে বলছেন তারা প্রীত বা সন্তুষ্ট হচ্ছে কিনা।

২) সম্যক কর্ম (Right Action, Pali: Samma-kammanto)ঃ সম্যক কর্ম (Reference from Sacca-vibhanga Sutta –MN 141, ভিক্ষুদের জন্য Magga-vibhanga Sutta– SN 45.8, ও গৃহীদের জন্য Cunda Kammaraputta Sutta – AN 10.176)। বিস্তারিত না গিয়ে সংক্ষেপে বলা যায়, সম্যক কর্ম বা কাজ বলতে হত্যা, চুরি এবং অসাধাচারন থেকে বিরত থাকা।

৩) সম্যক জীবিকা (Right Livelihood, Pali: Samma-ajivo)ঃ সম্যক জীবিকা Magga-vibhanga Sutta– SN 45.8 থেকে নেয়া। এখানে সম্যক জীবিকা বলতে অসধুপায়ে জীবিকা নির্বাহ করা থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিষ বানিজ্য, মাদক দ্রব্য ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, এবং প্রাণী হত্যা করত: মাংস বিক্রয় থেকে বিরত থাকা।

 

’অনন্ত বা অপরিসীম’ মানসিক স্তর (Illimitables Mental Factors, Pali: Appamanna)

’অনন্ত বা অপরিসীম’ মানসিক স্তরগুলো হচ্ছে মৈত্রী, করুণা মুদিতা এবং উপেক্ষা। যেহেতু ’মৈত্রী (Goodwill, Pali: Adosa or metta)’ এবং ’উপেক্ষা (Equanimity, Pali: Upekkha or Tatramajjhattata)’ এ দু’টি গুনাবলী শোভনীয় বা কুশল গুনাবলী বিভাগে দেখানো হয়েছে। সেহেতু ৫২টি মানসিক স্তরের (Mental States) মধ্যে নিম্নোক্ত ২টি মানসিক স্তরকে ’অনন্ত বা অপরিসীম’ মানসিক স্তর বিভাগে দেখানো হয়েছে। এই অনন্ত বা অপরিসীম মানসিক স্তরগুলোকে আবার ব্রহ্মবিহারও (সর্বোচ্চ মাত্রায় বা মহিমান্বিত জীবন-যাপন) বলা হয়। পরবর্তী দুইটি ’অনন্ত বা অপরিসীম’ মানসিক স্তরগুলি হচ্ছে

১) করুণা (Compassion, Pali: Karuna)

২) মুদিতা (Symphathetic joy, Pali: Mudita)

 

১) করুণা (Compassion, Pali: Karuna)ঃ যখন কারো ক্ষতিগ্রস্ত বা নিপীড়িত বা দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা দেখে অন্যের হৃদয় যদি আন্দোলিত হয় তখন এই গুনাবলীকে বলা হয় ‘করুণা’। অর্থাৎ একের দুঃখ অন্যের কাছে ছড়িয়ে পড়লে তা দূর করার আকাঙ্খাই  হচ্ছে এই গুনাবলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর প্রত্যক্ষ শত্রু হচ্ছে হিংসা এবং অপ্রত্যক্ষ শত্রু হচ্ছে শোক। এ গুনাবলীর কারনে নিষ্ঠুরতা দুর হয়। দালাই লামার মতে ‘করুণা হচ্ছে অনেকটা মাতৃস্নেহের ন্যায়।

 

২) মুদিতা (Symphathetic joy, Pali: Mudita)ঃ এটা নিছক সহানুভূতি নয় বরং প্রশংসাসূচক অভিব্যাক্তি বা আনন্দ। এটার প্রত্যক্ষ শত্রু হচ্ছে ঈর্ষা এবং অপ্রত্যক্ষ শত্রু হচ্ছে উল্লাস। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল অন্যের সমৃদ্ধিতে খুশি বা সূখানুভব হওয়া। এ গুনাবলীর কারনে মনের ’বিরাগ’ বা ’অপছন্দ-করা’ দুর হয় এবং অভিনন্দনমূলক মনোভাব স্থায়ী হয়।

 

প্রজ্ঞা (Wisdom Mental Factors, Pali: Pannindriya)

৫২টি মানসিক স্তরের (mental states) মধ্যে এটি সব্বোর্চ মানসিক স্তর।

১) প্রজ্ঞা (Wisdom, Pali: Pannindriya)ঃ অভিধর্মে প্রজ্ঞাকে অন্যভাবেও সম্বোধন করা হয়, যথাঃ জ্ঞান, পালি শব্দ ’অমোহ’ যার অপর অর্থ ‘ভাবনা’ বা ’প্রজ্ঞা’। প্রজ্ঞা অর্থ হল ‘যেটা জানা সেটা সঠিকভাবে জানা, অর্থাৎ অন্তর্ভেদী জ্ঞান’। এ গুণের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃতির স্বাভাবিক ধর্ম বা বাস্তবতাকে বোঝা বা জানা যাতে অবিদ্যা দূর হয়। বৌদ্ধধর্ম মতে প্রকৃতির স্বাভাবিক ধর্ম বা বাস্তবতা (nature of reality) হল ‘অনিত্য’ (impermanence), ’অনাত্মা (soullessness)’ এবং ’দুঃখ (sorrow)’ বা সন্তুষ্টির অভাব (lack of satisfaction)। 

উপসংহারঃ প্রজ্ঞা অর্জন করতে হলে উপরোক্ত মানসিক স্তরগুলো ভালভাবে জানতে (learn, Pali: pariyatti) হবে। জানার পর অনুশীলন (practice, Pali: patipatti) করতে হবে। অনুশীলন করতে করতে অন্তর্দৃষ্টি বা সম্যক দর্শন (penetration, Pali: pativedha) অর্জন হবে। ফলে অবিদ্যা (ignorance) দূর হয়ে বোধিজ্ঞান (enlightenment) অর্জনের পথ সুগম হবে এবং মানসিক সুখ অর্জিত হবে।

তথ্যসূত্র: 

  • Berzin, A; Linden, M. “What is Buddhism?”, Article 1,  https://studybuddhism.com/en/essentials/what-is/what-is-buddhism, 2003
  • H.H. Lama, Dalai; Cutler, C. H. The Art of Happiness-10th Anniversary Edition, 2009, p. 14, Penguin Books Ltd, London, England, ISBN 978-1-59448-889-4
  • Hasenkamp, W; “Fruits of the Buddhism-Science Dialogue in Contemplatative Research”, Current Opinion in Psychology, Elsevier, Volume 28, August 2019, p. 126-132
  • John Raymond Postgate (1995). “Microsenses”. The outer reaches of life. Cambridge University Press. p. 165. ISBN 9780521558730.
  • Kishimi, I; Koga, F. The Courage to be Happy, p. 8. Simon & Schuster Canada, Toronto, 2019, ISBN 978-1-9821-4226-1. 
  • Louangrath, Paul T.I; The Mind and Mental Faculties, Part 1 of 2, International Journal of Research & Methodology in Social Science Vol. 5, No. 1, p.17 (Jan. – Mar. 2019). ISSN 2415-0371 (online), p.19
  • Luisi, P.L. The Two Pillars of Buddhism-Consciousness and Ethics, from the Proceedings of the Meeting Mind and Life XII, ‘What is Matter, What is Life?’, Held in Dharamsala, India, in 2002, in the Presence of His Holiness the XIV Dalai Lama, P.86
  • মহাস্থবির, ধর্মাধার (১৯৭৭)। মিলিন্দ-প্রশ্ন (বঙ্গানুবাদ)। ধর্মাধার বৌদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশনী, ১, বুদ্ধিষ্ট টেম্পল ষ্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০১২, পৃঃ-৬৭।
  • Reeve,C.D.C., Miller, P.L. Introductory Readings in Ancient Greek and Roman Philosophy, 2nd Edition, Hackett Publishing Company Inc., Indianapolis/Cambridge, 2015, ISBN 978-1-62466-352-9, p. 316.
  • Science Daily, Religion, from https://www.sciencedaily.com/terms/religion.htm
  • Sugunasiri, Suwanda, H.J. Triune Mind in Buddhism : A Textual Exploration, Canadain Journal of Buddhist Studies, Number Ten, 2014, P.1
  • Skorupski, Tadeusz. The Buddhist Permutations of Consciousness, Religions of South Asia 8.1 (2014) 53-81, August 2014, ISSN (online) 1751-2697, P.2
  • Sohn Emily, Decoding Consciousness, Nature, Vol 571, 25 July 2019, p. s2-s5
  • Thera, Narada. A Manual of Abhidhamma, Revised Edition, 52 Kinds of Mental States, Chapter II, Maha Bodhi Book Agency, 2013, ISBN-13: 9789380336510

 

লেখক:রূপায়ন বড়ুয়া, পিইঞ্জ, অন্টারিও, কানাডা

শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো
© All rights reserved © 2019 bibartanonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbazarbibart251
error: Content is protected !!