শতদল বড়ুয়া
মাঘী পূর্ণিমা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য এক অনাবিল আনন্দের দিন। বছরের প্রতিটি দিনের মতো এদিন না হলেও বৌদ্ধজাতি প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিকে পুণ্যময় ক্ষণ হিসেবে পূজা ও প্রার্থনায় মশগুল থাকে। মনের প্রশান্তির জন্যে বৌদ্ধ বিহার যদিও একটা উত্তম স্থান তবুও কেন জানি আমরা পুণ্য কাজে তেমন অগ্রসর হচ্ছি না। মাঘী পূর্ণিমার আলোকে আলোকিত বৌদ্ধ সম্প্রদায় আজ ব্যস্ত সময় কাটাবে বিহারে গিয়ে। আমি একজন নগণ্য পত্রিকাসেবী। ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞানের পরিধিও আমার অতি সামান্য। তবুও বুকে অদম্য সাহস সঞ্চার করে উপলক্ষ হিসেবে কিছু লেখার প্রচেষ্টা চালাই। মাঘী পূর্ণিমার অতীত ঐতিহ্য এখন নেই বললে তেমন অত্যুক্তি হবে না। কারণ মাঘী পূর্ণিমার দিনে দু’টি আকর্ষণ বিদ্যমান ছিলো সেই অনেক আগে। একটি হলো সারাদিন বিহারে ধর্মীয় আয়োজন। আর দ্বিতীয়টা হলো- ‘মেলা’। আজকের তিথিকে কেন্দ্র করে তিনদিন পর্যন্ত চলতো ‘মেলা’। পালা করে চলতো গানের অনুষ্ঠান। আজ সেগুলো ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়ে নীরবে-নিভৃতে কাল যাপন করছে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে আজকের মাঘী পূর্ণিমা তিথি উপলক্ষে বলতে চাই- এভাবে চলতে থাকলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনবো, এর থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজে পাবো না। অধিকার আদায়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে দলাদলি ভুলে গিয়ে।
অধিকার আদায় করতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টার জুড়ি নেই। আবার অধিকার খর্ব হয় এমন কোনও কাজও যেনো আমরা না করি সেদিকে সকলকে খেয়াল রাখতে হবে। বুদ্ধনীতি অনুসরণ করলেই সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। আজকের এ শুভ পূর্ণিমা তিথিতে বলতে চাই, বুদ্ধ নির্দেশিত পথে যদি আমরা এগিয়ে যাই তাহলে দুঃখ-দুর্দশা থেকে অবশ্যই আমরা রেহাই পাবো। তাই আমি মাঘী পূর্ণিমার তাত্পর্য বুঝতে চেষ্টা করবো বুদ্ধের ‘সত্য ধর্ম’ বিষয়ে সামান্য আলোকপাতের মাধ্যমে। সত্য ধর্মের আলো জগতে জ্বলতে শুরু করেছে। পাপের অন্ধকার দূর হওয়ার সময় অত্যাসন্ন। এই মঙ্গলময় ধর্ম লাভের মানসে নিজের অন্তরকে ধর্মের প্রকাশে উদ্দীপিত করতে হবে। আমাদের মনের মধ্যে যে রাগ, দ্বেষ আর মোহ অক্টোপাসের মতো জাল বিস্তার করে আছে, এই জাল অপসারিত না করা পর্যন্ত কারো রেহাই মিলবে না। রাগ, দ্বেষ এবং মোহই পাপের অন্ধকার। এগুলোকে সরাতে পারলেই ‘সত্য ধর্মের’ প্রকাশ হবে। আমরা কিন্তু বড়ই ভাগ্যবান। সহজ-সরল বিধি আমরা লাভ করেছি। যার দ্বারা আমরা নিজের অন্তর্লোককে ধুয়ে সত্য ধর্মের পবিত্রতাকে ধারণ করতে পারি। এ সুযোগের যথার্থ মূল্যায়ন করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব। এ পথে চলতে হলে এটা কখনও অনিবার্য নয় যে কেউ নিজেই নিজেকে বৌদ্ধ বলি বা না বলি যদি আমরা সেই তথাগত ভগবানের দ্বারা প্রদর্শিত সহজ সরল পথকে একান্ত নিজের করে ভেতরের রাগ, দ্বেষ, মোহের কলুষকে অপসারিত করতে পারি তাহলে পরোক্ষভাবে আমরাই লাভবান হবো। সংসারে সুখ-শান্তি বিরাজ করবে। তখন আমরা নিজেদের যে নামেই ডাকি না কেন আমরাই কল্যাণকারী মার্গের যথার্থ অনুগামী, দুঃখ নিরোধগামিনী প্রতিপদার যথার্থ পথিক এবং সকল দুঃখকে দূর করার দিশা খুঁজে পাবো। সত্য ধর্মের অভাবেই আমরা উঁচু-নিচু পার্থক্য করে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করছি।
এ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে দিনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে ভোর ছয়টা থেকে। জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, বিশ্বশান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনার মধ্যদিয়ে ভিক্ষুসংঘরা দিনের তাত্পর্য তুলে ধরে পূজা উত্সর্গ, শীল প্রদান, খণ্ডকালীন ভাবনা, আলোচনা সভা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। উপাসক-উপাসিকারাও দিনভর মাতোয়ারা থাকবে ধর্মীয় কাজে। শিশু-কিশোরদের কলকাকলিতে মুখর থাকবে বিহার প্রাঙ্গণ।
সন্ধ্যায় নানা রঙের বাতিদ্বারা বিহারে করা হবে আলোকসজ্জা। নব উদ্দীপনায় পল্লবিত হবে প্রতিটি বৌদ্ধ পরিবার। বৌদ্ধ পল্লীগুলো থাকবে সরগরম, শহর-গ্রাম প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে থাকবে বিশেষ বিশেষ আয়োজন। মাঘী পূর্ণিমার এদিনে বিভিন্ন জায়গায় মেলাও বসবে। যেখানে থাকবে সকলের সমান অধিকার।
পরিশেষে বলবো- বৌদ্ধ বিহারের ন্যায় সকলের মন হোক পূত-পবিত্র। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, এ দেশে শান্তির বারিধারা বইতে থাকুক অনন্তকাল। সকলকে জানাই মাঘী পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভাশিস।
লেখক: সাংবাদিক