ব্যারিস্টার ড. অরবিন্দ বড়ুয়ার মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

সত্যব্রত বড়ুয়া: 

ব্যারিস্টার ড. অববিন্দ বড়ুয়ার ৩৬তম মৃত্যু বার্ষিকী ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮। তিনি ছিলেন বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে প্রথম ব্যারিস্টার (১৯৩৩) এবং পিএইচডি অর্জনকারী ব্যক্তি (১৯৩৩)। এর আগে এশিয়ায় প্রথম পিএইচডি প্রাপ্ত ব্যক্তি ছিলেন দার্শনিক ড. বেণীমাধব বড়ুয়া। এঁরা দু’জনেই ছিলেন একই গোষ্ঠীভুক্ত। উল্লেখযোগ্য ব্যারিস্টার ড. অরবিন্দ বড়ুয়া বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে প্রথম অবিভক্ত বাংলার বিধান সভার (এম.এল.সি) মনোনীত সদস্য ছিলেন (১৯৩৪)। কিন্তু তাঁর কর্মস্থল পশ্চিম বাংলায় হওয়ায় এখানে তিনি সেভাবে পরিচিতি লাভ করতে পেরেছিলেন না। এখনো যে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেছেন তাও আবার নয়। অরবিন্দ বড়ুয়া ২২ মার্চ ১৯০৭ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামের এক শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম অরবিন্দ দেওয়ার কারণ এ সময় বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের (পরবর্তীতে ঋষি অরবিন্দ) বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে সবাই আলোড়িত ছিল। তাঁর পিতা শিক্ষাব্রতী গগণ চন্দ্র বড়ুয়া ছিলেন একজন মহানুভব ব্যক্তি। শিক্ষা দীক্ষায় উন্নত হওয়ার কারণে এ সময় এ গ্রামটিকে ২য় বিলাত বলে অভিহিত করা হয়েছিলো। এ স্রোতধারা এখন আরো বেগবান হয়েছে। ড. মোঃ আবুল কাসেম তাঁর ‘ব্যারিস্টার অরবিন্দ বড়ুয়ার দৃষ্টান্ত ঃ আমাদের ভাবনা’ নিবন্ধটিতে লিখেছেন “তাঁর (অরবিন্দ বড়ুয়া) স্বগ্রাম বঙ্গদেশের সবচেয়ে বেশি বৌদ্ধ সম্প্রদায় অধ্যুষিত রাউজানের মহামুনি পাহাড়তলীর ঘরে ঘরে সে সময় আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটেছিলো”। অরবিন্দ বড়ুয়া ১৯২২ সালে মহামুনি এংলোপালি উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমান নাম মহামুনি উচ্চ বিদ্যালয়), প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.এ. ইতিহাসে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৯৩০ সালে উচ্চ শিক্ষার্থে লন্ডন গমন করেন এবং ১৯৩৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। একই সময় অরবিন্দ বড়ুয়া গ্রেজইন থেকে বার এট ল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি লন্ডন থেকে এসে কোলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এ সময় তাঁকে গভর্নর জন এন্ডারসন বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য মনোনীত করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে অরবিন্দ বড়ুয়া অতসী হালদারের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। অতসীর পিতা অসিত কুমার হালদার ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী। পরবর্তীতে অতসীও একজন খ্যাতিমান গুণী চিত্রশিল্পী হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা) প্রপৌত্রী। অতসী নামটি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি অরবিন্দ–অতসীর বিয়েতে এভাবে আশীর্বাদ প্রদান করেন–

“পূর্ণতা আসুক আজি তোমাদের তরুণ জীবনে

আনন্দে কল্যাণে প্রেমে শুভলগ্নে শুভসম্মিলনে।”

ড. অরবিন্দ বড়ুয়া আইন সভার সদস্য থাকাকালীন তাঁর প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব এবং চারিত্রিক মাধুর্য দরুণ রাজেন্দ্র প্রসাদ, জওহরলাল নেহেরু, সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎ চন্দ্র বসু, শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, শেরে বাংলা ফজলুল হক প্রমুখ বিখ্যাত রাজনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। বাঙালি বৌদ্ধদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ড. অরবিন্দ বড়ুয়া সবসময় সোচ্চার ছিলেন। বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে থাকাকালীন তিনি সমাজ শাখার অধিবেশনে লিখিতভাবে বলেন, ”১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনে বৌদ্ধদের শাসন ব্যাপারে কোন স্বতন্ত্র অধিকার না দেওয়াতে তাহাদের প্রতি যে অবিচার করা হইয়াছে সে ব্যাপারে কাহারো সন্দেহ থাকিতে পারেনা। সত্যবটে বাংলাদেশে বৌদ্ধদের সংখ্যা অতিঅল্প কিন্তু তথাপি যদি ২৮০০ এঙলো ইন্ডিয়ানদের জন্য বঙ্গীয় ব্যব পরিষদে তাঁদের স্বার্থ রক্ষার জন্য চারটি সদস্য পদ থাকতে পারে তবে ৩০,০০০ বঙ্গীয় বৌদ্ধ তাহাদের সংখ্যানুরূপ সদস্য কেন পাইবেনা তাহার কারণ বুঝিয়া ওঠা কঠিন। ১৯৩৫ সালের ব্রিটিশ প্রবর্তিত ভারত শাসন আইনে স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে বৌদ্ধদের স্বীকৃতি না দেওয়াতে তাহারা না হিন্দু না মুসলমান এই পর্যায়ে একটি ত্রিশংকু অবস্থানে ছিল বলে বঙ্গীয় আইন পরিষদে তাদের জন্য কোন আসন নির্দিষ্ট ছিলনা। পরে বাঙালি বৌদ্ধদের প্রবল চাপের মুখে বাংলার গভর্নর কর্তৃক একজন সদস্য মনোনয়নের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়” (সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রাক্তন প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাংবাদিক ডি. পি. বড়ুয়ার গ্রন্থ ‘বাঙালি বৌদ্ধদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য’)। ১৯৩৯ সালে নাজিমুদ্দিন মন্ত্রি সভায় যুগান্তকারী ক্যালকাটা এমেন্ডমেন্ড বিলে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করায় সদস্যপদ হারান। তাঁর এই সাহসী ভূমিকার জন্য সর্বমহল হতে তিনি অভিনন্দিত হন। পরবর্তীতে তিনি কোলকাতা কর্পোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা হয়েছিলেন। এ সময় তিনি অনেককে চাকুরি প্রদান করেন। বিশেষ করে শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীদের প্রতি তাঁর দৃষ্টি বেশি ছিলো। এঁদের মধ্যে অনেকেই তাঁর সহযোগিতায় কর্পোরেশনে চাকুরী পেয়েছিলেন। বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী আমাকে একবার বলেছিলেন, আমাদের ভরসা স্থল ছিলেন অরবিন্দ বড়ুয়া। আমরা চট্টগ্রামের মানুষ কোলকাতায় গেলেই আমাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তাঁকে বলতাম। তিনি সমস্যাগুলো নিরসন করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন। অরবিন্দ বড়য়া বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি তাঁর যোগ্যতার গুণে ভারতীয় মহাবোধি সোসাইটির সম্পাদক হন এবং উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৫০ খ্রীষ্টাব্দে অরবিন্দ বড়ুয়া ডাব্লই এফ বি এর ভাইস প্রেসিডেণ্ট হন। তিনি বহুবার বৌদ্ধ প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন বৌদ্ধ প্রধান দেশে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে যোগদান করে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহার প্রাঙ্গনকে তিনি শিক্ষা ও সমাজ সেবা কেন্দ্রে পরিণত করেন। ১৯৫২ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত ডাব্লই এফ বি সম্মেলনে যোগদান করেন এবং ভারতের সাথে যোগসূত্র স্থাপনে অবদান রাখেন। ১৯৫৪ সালে অরবিন্দ বড়ুয়া বার্মায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সঙ্গিতিতে যোগদান করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিলেন। ভারতে ১৯৫৬ সালে উদযাপিত মহামানব বুদ্ধের ২৫০০ জয়ন্তীতে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। বৌদ্ধ পত্রিকাগুলোর প্রতি তাঁর বিশেষ দৃষ্টি ছিলো। ’মাসিক জাগরণী’ তিনিই শুরু করেছিলেন। নালন্দা সাময়িকী প্রকাশেও ড. বড়ুয়ার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিলো। তিনি বাগীশবন্ধু মৃৎমুদ্দীর সঙ্গে একটি ইংরেজি দ্বীমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। ড. অরবিন্দ বড়ুয়া রাষ্ট্রপাল মহাথেরোকে বুদ্ধগয়ায় আন্তর্জাতিক ভাবনা কেন্দ্র স্থাপনে সক্রিয়ভাবে সহায়তা প্রদান করেন। ১৯৩৮ সালে রাউজানের হোঁয়ারা পাড়ায় অগ্রসার জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত সভায় তিনি একটি অনন্য ভাষণ প্রদান করেছিলেন। তিনি যখন আইন সভার সদস্য ছিলেন তখন বৌদ্ধ সমাজের শিক্ষা বিস্তারের জন্য তৎকালিন ব্রিটিশ সরকার হতে সর্বপ্রথম বার্ষিক দশ হাজার টাকা বৃত্তি লাভের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন (সূত্র: নতুনচন্দ্র বড়ুয়ার রচিত বই ’চট্টগ্রামের বৌদ্ধ জাতির ইতিহাস’)। ছেলেবেলা হতেই ড. অরবিন্দ বড়ুয়া স্বাধীনচেতা এবং দেশপ্রেমিক ছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন–সংগ্রামে তাঁকে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। ইংল্যান্ড যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি খাদি কাপড় পড়তেন। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সামগ্রিক উন্নতির জন্য ড. বড়ুয়া তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু তিনি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বিদগ্ধজনের সাথে তাঁর সুনিবিড় সম্পর্ক ছিলো। তাঁর পরিশীলিত জীবনাচরণ ছিল মানুষের কাছে আদর্শ উদাহরণ। অরবিন্দ বড়ুয়ার জীবনের নানাদিক সম্পর্কে এখনো আমাদের অনেক কিছু জানার আছে। বাস্তবতা হলো তাঁকে নিয়ে আমাদের চর্চা খুব কমই হয়েছে। তিনি চট্টগ্রামের সন্তান হলেও প্রচারের অভাবে এখানকার মানুষের কাছে এখন পর্যন্ত প্রায় অপরিচিতই হয়ে রয়েছেন। বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর এ জন্যে বিশেষ কর্মকাণ্ড গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। ব্যারিস্টার অরবিন্দ বড়ুয়া ৫ সন্তানের জনক ছিলেন। বর্তমানে ২ কন্যা জীবিত রয়েছেন। তাঁরা কোলকাতায় বসবাস করেন। অরবিন্দ বড়ুয়ার সহধর্মিনী অতসী বড়ুয়া ২০১৬ সালে (জন্ম ১৯২২) ৯৪ বৎসর বয়সে কোলকাতায় প্রয়াত হয়েছেন। ব্যারিস্টার ড. অরবিন্দ বড়ুয়ার ৩৬তম মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁকে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।

লেখক : রম্য লেখক

Leave a Reply

error: Content is protected !!